এক নিঃসঙ্গ জোনাকির গল্প বিকেলের ম্লান আলোটা যখন ড্রইংরুমের জানলা গলে,বুড়ো ইজি চেয়ারটায় এসে পড়ে, তখন ঘড়ির টিকটিক শব্দটা বড্ড বেশি চড়া শোনায়। বাইরে তখন ঢাক বাজছে, অষ্টমীর আরতি চলছে। দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো ছবিটার দিকে তাকিয়ে,সুধীরবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। সেই ছবিতে একঝাঁক হাসিমুখ, ছেলে,মেয়ে,নাতি,নাতনি। অথচ এই চার দেয়ালের বিশাল ফ্ল্যাটে তিনি একাই একছত্র সম্রাট,যার রাজ্যের প্রজারা সবাই ব্যস্ত,দূর প্রবাসী। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "পুরানো সেই দিনের কথা,ভুলবি কিরে হায় ও সে..."I কিন্তু আধুনিক জীবনের ঘূর্ণাবর্তে,মানুষ শুধু পুরানো দিন নয়,পুরানো মানুষদেরও ভুলতে বসেছে। প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা আজ শুধুমাত্র সামাজিক ব্যাধি নয়,এটি একটি নীরব মনস্তাত্ত্বিক মহামারী,যা আমাদের অজান্তেই গ্রাস করছে সমাজের শিকড়কে। যৌথ পরিবার, এক সময় ছিল সমাজের বটগাছ আর সেই গাছের মূল ছিলেন প্রবীণরা। বাড়ির ঠাকুরদালানে বা রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে, দাদু-ঠাকুমাদের গল্পের ঝুলি থেকে ঝরে পড়ত রূপকথা। কালের নিয়মে সেই রূপকথা চাপা পড়েছে বহুতল বাড়ি আর ফ্ল্যাট কালচারে।
নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগে,প্রবীণরা আজ বড্ড বেশি অপ্রাসঙ্গিক। তাদের সন্তানরা ছুটছে জীবিকার তাগিদে,নাতি-নাতনিরা ব্যস্ত ভার্চুয়াল জগৎ আর পড়াশুনার ইঁদুর দৌড়ে।আর এসবের মাঝে ঘরের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষটি হয়ে পরছেন একা। প্রযুক্তি আর যোগাযোগের মাধ্যম যত উন্নত হচ্ছে,সোশ্যাল মিডিয়া তে আমরা যত কাছে আসছি,বাস্তব জীবনে আমাদের মধ্যে দূরত্ব ততো বেশি প্রকট হয়েছে। ড্রইংরুমে ছেলে-মেয়ে যখন ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত,ঠিক তখনই পাশের ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মা একটু কথা বলার জন্য বসে আছেন। "ডিজিটাল আইসোলেশন", প্রবীণদের মনে গভীর হীনমন্যতা তৈরী করে, অনেকটা ঠিক তুবড়ে যাওয়া হারিকেনের মতো,অস্তিত্ব আছে,কিন্তু প্রয়োজন নেই। মনোবিজ্ঞানীদের মতে,জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, মানুষ হয়ে যায় শিশুর মতোই। সঙ্গী হারানোর শোক,শারীরিক অসুখ,কর্মহীনতা মানুষকে মানসিক ভাবে দুর্বল করে দেয়। এসবের সাথে যখন একাকিত্ব সঙ্গী হয়,সেই মানুষটাকে ঘিরে ধরে ডিপ্রেশন। বৃদ্ধাশ্রমের সাদা-রঙিন দেওয়ালগুলো, তাই আজও হাজারো না বলা অভিমানের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু ফেরার পথ কোথায়? ফেরাতে আমরাই পারি। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সাথে দিনের শেষে কাটানো যেতে পারে একটা সুন্দর সময়,হোক না সেটা আধা ঘন্টা। আমরা না হয় মন দিয়ে শুনি তাদের কথা, তাদের জীবনের চাওয়া-পাওয়া হতাশার গল্প। আলোচনা চলুক সাহিত্য,রাজনীতি বা কোনো পুরানো স্মৃতি নিয়ে। পাড়ায়,আবাসনে প্রবীণদের জন্য আরো বেশি করে তৈরী হোক লাইব্রেরি, পার্ক,সেখানে থাকুক সন্ধ্যের আড্ডা,গান,গল্প,কবিতা,আর থাকুক তাদের সমবয়সীদের সাথে মন খুলে হাসি। উৎসবের দিন গুলো সবাই ফিরে আসুক বাড়িতে, একসাথে খাওয়া-দাওয়া, ঠাকুর দেখা, হই হুল্লোড়, আড্ডা চলুক। জীবনের শেষ অধ্যায়টা যেন তাদের জন্য ট্রাজিক উপন্যাস না হয়ে ওঠে। গোধূলির আলো, ভোরের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়না ঠিকই, কিন্তু সেই আলোয় থাকে শান্ত মায়াবী স্নিগ্ধতা। আমাদের একটু খানি স্পর্শে সেই আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ুক। উৎসবের দিন গুলো নিঃসঙ্গতা নয় কাটুক পরিবারের সাথে। শারদীয়ার শুভেচ্ছা সকলকে।