পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে দূরত্ব মোটে ৩০ কিলোমিটার। আর সেখানেই ভগ্নপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের অন্যতম রহস্যময় এক মন্দির। ১২৫৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম নরসিংহদেব নির্মিত এই মন্দিরটি অসাধারণ ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত, তেমনই এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে শত বছরের পুরনো এক রোমাঞ্চকর রহস্য। সংস্কৃত শব্দ কোন ও অর্ক এই দুটি শব্দের মিলনে মন্দিরের নাম হয় কোনারক। এক্ষেত্রে অর্ক শব্দটির অর্থ হল সূর্য। তাই এই মন্দির সূর্যদেবের উদেশ্যে নিবেদিত। কালো গ্রানাইট ও লাল বেলেপাথরে গোটা মন্দিরটি নির্মিত হয়। মন্দিরটি তিনটে অংশে বিভক্ত ছিল। কালাপাহাড়ের আক্রমণে মূল দিত কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পরবর্তীকালে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় মূল মন্দিরের অংশটি উদ্ধার করেন ভাইসরয় লর্ড কার্জন। সেই ভগ্নপ্রায় মন্দির যাতে পুরোপুরি ধসে না যায় তাই তাতে বালি ও পাথর ভরে দিয়ে মন্দির বন্ধ করে দেন ব্রিটিশ শাসকরা।
কোনারকের সূর্য মন্দির, এদেশের স্থাপত্য কীর্তিগুলির মধ্যে একটি। কিন্তু ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে এই মন্দির অভিশপ্ত। প্রাচীন লোককথা ও সে আমলের কিছু বিবরণ অনুযায়ী, কোনার্ক মন্দিরের চূড়ায় একটি বাহান্ন টনের বিশাল চুম্বক বসানো ছিল। শুধু চূড়াতেই নয়, মন্দিরের প্রধান গর্ভগৃহের দেওয়ালে এবং মেঝেতেও সুকৌশলে বিভিন্ন জায়গায় চুম্বক স্থাপন করা হয়েছিল। মূল কারিগরেরা চুম্বকীয় আকর্ষণের এমন এক নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য তৈরি করেছিলেন, যার ফলে গর্ভগৃহে থাকা সূর্যদেবের মূর্তিটি কোনো রকম অবলম্বন ছাড়াই শূন্যে ভেসে থাকত।
কিন্তু ওই ৫২ টনের বিশাল ওই চুম্বক সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজকে পাড়ে এনে আছড়ে ফেলত। চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা কাটিয়ে পুরীর সমুদ্রে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারত না। সেই কারণেই কোনারকের মন্দিরকে অভিশপ্ত বলে উল্লেখ করেন তাঁরা। দূর থেকে এই সুবিশাল কালো রঙের মন্দিরটিকে দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো লাগত বলে পর্তুগিজ নাবিকরা এর নাম দিয়েছিলেন ‘ব্ল্যাক প্যাগোডা’। কথিত আছে, মন্দিরের চূড়ায় থাকা শক্তিশালী চুম্বকের চৌম্বক ক্ষেত্র সমুদ্রের উপকূলবর্তী অঞ্চলে এতটাই প্রভাব ফেলত যে, পাশ দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কম্পাস উল্টোপাল্টা ঘুরতে শুরু করত। দিকভ্রান্ত হয়ে বহু বাণিজ্যিক জাহাজ চন্দ্রভাগা সৈকতের গুপ্ত চড়ায় ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়ে যেত।
এই ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ষোড়শ শতাব্দীতে একদল পর্তুগিজ নাবিক মন্দিরের চূড়ার এই চুম্বকটি খুলে নিয়ে যায়। আর চূড়া থেকে চুম্বকটি সরিয়ে ফেলার ফলেই মন্দিরের ভেতরের চৌম্বকীয় ভারসাম্য চিরতরে নষ্ট হয় এবং কালক্রমে প্রধান মূল মন্দিরটি ভেঙে পড়ে। তবে ওডিশার ইতিহাস ও বেশ কিছু নথি অনুযায়ী, ১৫০৮-এ কালাপাহাড় পুরী আক্রমণ করেন, আর তাঁর হামলাতেই ধ্বংস হয় সূর্য মন্দির। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, মন্দির ধ্বংসের সময় চূড়ায় থাকা অতিকায় ওই চুম্বকটিকে সরানোর নির্দেশ দেন সেনাপতি কালাপাহাড় আর তাতেই ভারসাম্য নষ্ট হয় মন্দিরের। ফলে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে গোটা মন্দির। ব্রিটিশরা যে মন্দিরের গর্ভগৃহ বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই মন্দির আজও আর খোলা হয়নি। শত ইতিহাস আর রহস্য নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে কোনার্ক।