আজ তৃতীয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে মা যাত্রা শুরু করছেন গতকাল থেকেই। পঞ্চমীর মধ্যে মণ্ডপ আলো করে বসবেন জগৎজননী মহামায়া। যিনি দশহাত দিয়ে আগলে রেখেছেন গোটা বিশ্বকে। কিন্তু ওনাকে যারা বানিয়েছেন, এই মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে ওঠার গল্পটা কিন্তু বড্ড মিষ্টি। নিজের সন্তানের মত একটু একটু করে গড়ে তোলা মা, তৃতীয়া-চতুর্থীতে রওনা দেন মণ্ডপে। দশমীর আগেই বিদায় সুর বেজে ওঠে মৃৎ-শিল্পীদের ঘর গুলিতে। মা রেখে যান একটুকরো আলো আর অনেকটা আশা।
পূজার আগের চার-পাঁচ মাস শুধু কলকাতার কুমোরটুলিই না, গোটা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের পালপাড়ায় শুরু হয় ব্যস্ততা। দম ফেলার ফুসরত থাকে না কারোর। খড়, মাটি আর বাঁশের কাঠামোর ওপর মহামায়াকে ফুটিয়ে তোলার কাজ চলে। দিন-রাত এক করে তুলির টানে দেবীর রূপ দিতে ব্যস্ত থাকেন শিল্পীরা। মাটির গন্ধ, খড়ের স্তূপ আর রঙের প্রলেপের ব্যস্ততায় মুখর থাকে প্রতিটা পালের ঘর। অথচ, তৃতীয়া-চতুর্থী পেরিয়ে যেতেই ব্যস্ততার চাদরটা এক ঝটকায় খুলে যায়। উমা বিদায় নেওয়ার সাথে সাথেই মৃৎশিল্পীদের সেই ভরতি ঘরগুলো এক নিমেষে ফাঁকা হয়ে যায়। যে দেবীপ্রতিমাকে তারা সন্তানের মতো আদর-যত্নে, বিন্দু ঘাম, রক্ত-জল করে গড়ে তুলেছিলেন, তারা আজ মণ্ডপ আলো করে বসে আছেন। পালের ঘরে এক কোণে পড়ে থাকে শুধু কিছু বাড়তি খড়, শুকিয়ে যাওয়া মাটির ডেলা আর রঙের খালি কৌটোগুলো। ঘরগুলোতে ভরে থাকে একরাশ শূন্যতা আর অন্ধকার।
তবে এই শূন্যতা শুধু ঘরগুলোতেই নয়, শিল্পীদের মনেরও। সন্তানসম প্রতিমাকে বিদায় দেওয়ার প্রচ্ছন্ন বেদনা লুকিয়ে থাকে প্রতিটা শিল্পীর মনে। এই বিষণ্ণতা আরও চেপে বসে আর্থিক অনিশ্চয়তাকে ঘিরে। কলকাতা বা শহরতলি বাদ দিলে অনেকাংশেই পূজার মরশুমে যেটুকু উপার্জন হয়, তা দিয়ে বছরের বাকি দিনগুলো কাটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। উৎসব শেষ হতেই মৃৎশিল্পীদের মাথায় চেপে বসে আগামী দিনগুলোর খরচের চিন্তা। অনেকেই তখন পেটের দায়ে মাটির কাজ ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করতে বাধ্য হন বা কেউ করেন চাষাবাদ। যদিও বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বণ, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা কার্তিকপূজা-র প্রতিমা তৈরি শুরু করেন, তবে তাতে দুর্গাপূজার মতো বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক থাকে না।
উৎসব শেষে মৃৎশিল্পীদের অন্ধকার ঘরে ফেরার গল্পটা কিন্তু প্রতি বছরের। ঢাকের আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার পর আমরা যখন আবার যার যার চেনা জীবনে ফিরে যাই, তখন ভাঙা মন আর অনিশ্চয়তা নিয়ে শিল্পীরা অপেক্ষা করতে শুরু করেন আগামী বছরের। আবার কবে আসবে শরৎ, আবার কবে তাদের এই শূন্য ঘরগুলো মাটির গন্ধে, উমার আগমনে মুখরিত হয়ে উঠবে, এই আশাতেই কেটে যায় তাদের বাকি ৩০০ দিন।