গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মতে আজ সপ্তমী। বেলতলায় মায়ের বোধন শেষে আজ শুরু হবে মূল পূজা। মহাসপ্তমীর ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথেই ঢাকের আওয়াজ আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চরাচর। সপ্তমী থেকেই শুরু হয় দেবীর ষোড়শ উপাচারে পূজা সহ প্রতিমাস্থ দেব-দেবী ও আবরণ দেব-দেবীদের পূজা। সপ্তমীর গুরুত্বপূর্ণ আচারটি হলো নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপন এরপরে ক্রমানুসারে মহাস্নান, চক্ষুদান, প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও মূল পূজা হয়ে থাকে।
কলা সহ নয়টি গাছকে (কলা, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল, দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধান) একত্র করে তৈরি হয় নবপত্রিকা। এই নয়টি গাছ দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীক। শুধু তাই-ই নয়, পৃথিবীর প্রতিটা উপাদানেই যে দুর্গা তত্ত্ব বর্তমান তারই প্রতীক হিসাবে রয়ে গেছে এই নবপত্রিকা। মহাসপ্তমীর ভোরে এই নবপত্রিকাকে নদী বা জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে শাস্ত্রীয় বিধি মেনে স্নান করানো হয়। স্নান শেষে নতুন শাড়ি পরিয়ে তাকে গণেশের ডান পাশে স্থাপন করা হয়। প্রকৃতি ও দেবীর এই মেলবন্ধন মূলত আদিম শস্য উপাসনারই চিরন্তন রূপ।
শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান একটি আচার হলো দেবীর মহাস্নান। সপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমী তিথিতে এই স্নান পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়। দেবীর সামনে থাকা দর্পণ প্রতিবিম্বের ওপর বিভিন্ন পবিত্র উপাদান অর্পণ করে মহাস্নান সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। এই আচারের মূল উদ্দেশ্য প্রকৃতির সমস্ত বস্তুকে একীভূত করে আদিশক্তি মহামায়ার আবাহন করা। শাস্ত্র মতে, দেবীকে স্নান করাতে বিভিন্ন তেল সহ প্রায় ৩৫ ধরনের সামগ্রী প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো গঙ্গাজল, মহাসমুদ্রের জল, বৃষ্টির জল, সরস্বতী নদীর জল এবং পদ্মরেণু মিশ্রিত জল। শুধু জলই নয়, স্নানের উপচারে লাগে পঞ্চগব্য (গোমূত্র, গোময়, দুগ্ধ, দধি, ঘৃত), পঞ্চ কষায় (জাম, শিমূল, বেড়েলা, বকুল ও টোপাকূলের ছাল), কুশ জল, চন্দন, মধু এবং আখের রস। এছাড়া, সমাজের সর্বস্তরের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বেশ্যাদ্বারের মাটি, রাজদ্বারের মাটি সহ মোট ১৭ ধরণের মাটি এই স্নানের উপচারে ব্যবহৃত হয়।
মহাস্নানের পরেই ঘি ও আগুনের তাপে নির্মিত কজ্জল দ্বারা বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে প্রথমে দেবীর ঊর্ধ নেত্র, পরে ডান ও বাম নেত্রে চক্ষুদান করা হয়ে থাকে। পূজার ক্রমানুযায়ী এরপরে আসে প্রাণ প্ৰতিষ্ঠা। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ এবং কুশ ও দর্ভের স্পর্শে মাটির প্রতিমাতে দেবীর দিব্য চেতনাকে আহ্বান করা হয়, মৃণ্ময়ী থেকে দেবী হন চিন্ময়ী। একই পদ্ধতিতে প্রতিমাস্থ অন্যান্য দেব-দেবীরও চক্ষুদান ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। এরপর শুরু হয় ষোড়শোপচার পূজা, দেবীকে ফলমূল, মিষ্টি ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। ক্রমে আবরণ দেবদেবীর পূজা ও স্তব-কবচ ও চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে সপ্তমী পূজা শেষ হয়।
দুর্গাপূজা মহাপূজা, বলা হয় এই পূজা করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল পাওয়া সম্ভব। আর মহাসপ্তমীর এই ঐতিহ্যবাহী আচারগুলো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জাগরণ এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।