আজ মহালয়া, পিতৃপক্ষের শেষে দেবী পক্ষের সূচনা। এর মাঝেই শহরের শপিংমল গুলো লাস্ট মোমেন্টের জন্য আস্তিন গোটাচ্ছে। এসো বাঙালি, তোমাদের পূজা এসে গেছে। ঢাকে কাঠি পড়তে আর বাকি পাক্কা পাঁচটা দিন, এখনও অবশ্য লাইট, প্যান্ডেলের কাজ কিছুটা বাকি। কিন্তু শহর হাত গুটিয়ে বসে নেই। সেই কবেই শুরু হয়ে গেছে থিম, পরিকল্পনা, ঠাকুর,প্যান্ডেলের কাজ। অর্ডারের চাপে, রথের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ঠাকুর বানানো। মোটামুটি বৈশাখ শুরু হতে না হতেই খড় বাঁধা শুরু হয় কাঠামোয়, কুমোরপাড়ায় চলে ব্যস্ততা। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও কোথাও যেন কাজের তাল কাটে। মূল্যবৃদ্ধির খাঁড়া এসে পড়েছে, এই মৃৎশিল্পেও। কাঁচামাল, মাটি, রংয়ের আকাশছোঁয়া দাম কোথাও গিয়ে ছন্দ নষ্ট করেছে উৎসবের। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কোনও মতে কাজ শেষ করলেও, সেই ঋণের বোঝা থেকেই যায় শিল্পীর উপরে। তার উপরে থিম পূজার রমরমায় বিপাকে পরেন সাবেকি প্রতিমা শিল্পীরা। অনেক সময়ে ক্লাব কমিটি গুলির চাহিদা মতো মূর্তি তৈরী না করতে পেরে বাধ্য হয়ে ছাড়তে হয় অর্ডার। যাদের হাতের ছোঁয়ায় মৃম্ময়ী হন চিন্ময়ী, দশমীর শেষে যেন তাদের ঘরে আরও বিষাদের সুর বাজে।
ঢাকের আওয়াজ ছাড়া দূর্গা পূজা ভাবা যায় নাকি? চতুর্থীর রাত দশটা,একনাগাড়ে ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর থেকে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঢাকিদের বায়না করে নিয়ে যাচ্ছে ক্লাব কমিটি গুলি। অনর্গল ভেসে আসছে, "আরেকটু কম করো" বায়না। বাধ্য হয়েই বাঁকুড়া, পুরুলিয়া বা মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা ঢাকির দল পাড়ি জমায় ক্লাব গুলোর উদ্দেশ্যে। পূজার এই কটা দিন ওদের রোজগার, বছরের বাকি সময় পরের জমিতে চাষ বা অন্য কোনও কাজ করে ওদের দিন চলে। আমোদ প্রমোদ, আরও অনেক খাতে হাজার হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও, ওদের বরাদ্দ থাকে খুবই কম,ঠাঁই হয় ক্লাব ঘরের কোণে । কিন্তু উপায় কি, যা পাওয়া যায়, অন্তত দুটো কি তিনটে নতুন জামা নিয়ে বাড়ি ফিরতে তো পারবে ওরা, আমাদের দশমী ওদের অন্য পূজার শুরু।
থিম পূজা আর মাস আর্টের হাত ধরে প্যান্ডেলের কাজ শুরু হয় মোটামুটি মার্চ-এপ্রিল থেকেই। একজন শিল্পীর ভাবনা বাঁশ আর কাপড়ে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে চব্বিশ পরগনা বা মেদিনীপুর থেকে আসা মণ্ডপশ্রমিকরা। সেই বাঁশ পোঁতা থেকে থিমের সূক্ষ শেষ টান অব্দি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যায় ওরা। পরিবার, সন্তানদের ছেড়ে শুধুমাত্র রোজগারের জন্য গোটা পূজা ওরা কাটিয়ে দেয় প্যান্ডেলের পিছন দিকে। পর্যাপ্ত সুরক্ষা বিধি ছাড়া ওরা কাজ করে চলে। বিসর্জনের পরে মা যখন ফিরে যায় কৈলাসে, ওরা তখন বাঁশ খুলতে থাকে, সামনে আবার আলোর উৎসব যে।
দশমীর ঢাক বেজে ওঠে, সিঁদুর খেলা দিয়ে শেষ হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব। আলো নিভতে থাকে এক এক করে, মা ফিরে যান পতিগৃহে। আর ওরাও ফিরে যায় নিজের নিজের ঘরে। হয়তো আনন্দ নিয়ে বা এক রাশ মন খারাপ নিয়ে। কুমোর পাড়ায় ফের ব্যস্ততা শুরু হয় জল থেকে কাঠামো তুলে আনার, ঢাকিরা ফেরে নিজের নিজের জীবিকায়,আর প্যান্ডেল চলে যায় কালীপূজা বা জগদ্ধাত্রী পূজা কমিটি গুলোয়। উৎসব আসে উৎসব যায়, ওরা থেকে যায় আঁধারে। আমাদের দুর্গোৎসব UNESCO Intangible Cultural Heritage এর তকমা পেয়েছে। কিন্তু এই উৎসবের বিশ্বজনীন স্বীকৃতির মূল দাবীদার এই প্যান্ডেল কারিগর, লাইট টেকনিশিয়ান, মৃৎশিল্পী, ডুলি আরও অনেকেই যারা নিজের উৎসব কে বিসর্জন দিয়ে আমাদের একটা সুন্দর পূজা উপহার দিয়ে যায়। কিন্তু কর্পোরেট বাজেট আর জাঁকজমকের ভিড়ে নেপথ্যের কারিগরদের যদি আমরা ন্যায্য পাওনা আর প্রাপ্য সম্মান না দিতে পারি, তাহলে এই উৎসবের জৌলুস কিছুটা হলেও ম্লান হয়।