কালো মেঘের চাদর সরিয়ে আকাশ এখন নীল। তুলোর মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে এধার ওধার। আবহাওয়া মোটামুটি জানান দিয়ে যাচ্ছে, উৎসবের শুরু হয়ে গেছে, খালি ঢাকে কাঠি পড়ার অপেক্ষা। বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণ, আর সেই মহা-পার্বণ সূচনার আগে, উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে বিশ্বকর্মা পূজা। ভাদ্র সংক্রান্তিতে দেবশিল্পীর আরাধনা দিয়েই মোটামুটি বাঙালি উৎসবের টাইম লাইনে ঢুকে যায়। ভারতের অন্য রাজ্যে দেবশিল্পীর এভাবে আরাধনা না হলেও, বাংলায় বিশ্বকর্মাপূজার চল বহু পুরানো। শাস্ত্রীয় আচারের বাইরে বেরিয়ে, এই পূজা হয়ে উঠেছে শ্রমিক শ্রেণীর 'নিজের পূজা', একটা সময়ে সমাজের এই শ্রমিক শ্রেণী বহু জায়গা থেকে বিতাড়িত হতে হতে যখন কোনঠাসা, সেই সময়েই বিশ্বকর্মা হয়ে ওঠে এই শ্রেণীর নিজস্ব দেবতা। তবে খুব গভীরে গিয়ে দেখলে, এই পূজা শুধু একটা পার্বণ না, এই পূজা শ্রমের পূজা, যন্ত্রের পূজা এবং সকল শ্রমিকদের মেধা ও কারিগরির পূজা।
পৌরাণিক মতে, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা হলেন সৃষ্টি ও কারিগরির দেবতা। লঙ্কা, দ্বারকা নগরী, বা পুরীর শ্রী মন্দিরের জগন্নাথ মূর্তি, সবই তার সৃষ্টি। কিন্তু মজার বিষয় সমকালীন সমাজ ও আধুনিক প্রেক্ষাপটে এই পূজা মানুষের সৃষ্টিশীলতা, কারিগরি দক্ষতা এবং শিল্প চেতনার প্রতীক। একজন রাজমিস্ত্রী, ছুতোর, কামার থেকে কুমোর বা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, প্রত্যেকের কাজেই রূপক হয়ে থেকে গেছেন বিশ্বকর্মা।
জাতপাত, উপর-নিচ, শ্রেণী বিভাগের এই সমাজে শ্রমিকরা বরাবরই ব্রাত্য। বললে খুব ভুল হবে না যে তাদেরকে সবসময়েই বাঁকা চোখে দেখে এসেছে তথাকথিত ভদ্র মানুষরা। যে মানুষটা রিকশা চালায়, যে মানুষটা অটো চালায়, যে মানুষটা প্রতিদিন স্টেশনে জুতো সেলাই করতে বসে, আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই, ওরাও আমাদের সমাজের অঙ্গ। আনন্দ-উৎসবের সমান অধিকার ওদেরও আছে। কিন্তু কোথাও না কোথাও আমরা এই যুগে দাঁড়িয়েও চোখ কুঁচকোই। নদী যেমন নিজের গতিপথ নিজে ঠিক করে নেয়, সমাজের এই শিথিলতাও বেশ নিজের পথ খুঁজে নেয়। আর সেই পথ ধরেই এই বিশ্বকর্মার পূজা হয়ে গেল 'ওদের নিজেদের পূজা'। ওরা নাচে, ওরা গান গায়, অল্প বিস্তর মদ খেয়ে আনন্দ করে।
মালিক আর শ্রমিক শ্রেণীর দূরত্ব চিরকালের, আগেও ছিল হয়ত এখনও আছে। আমরা সাম্যের বুলি কপচে গেলেও সেটা কাজে কতটা হয় বলা মুশকিল। কিন্তু এই একটা দিন সম্ভবত এই ব্যবধানটা একটু হলেও কমে যায়। একজন পুঁজিপতি বরাবরই নির্ভরশীল এই শ্রমিক গোষ্ঠীর উপরে। সেটা কারখানা হোক বা চাষের ক্ষেত, ওরা কাজ না করলে থমকে যায় গোটা সমাজ। আর এখানেই গুরুত্ব রাখে এই পূজা। এই একটা দিনই শ্রমিক-মালিক এক হয়ে মেতে ওঠে দেবশিল্পীর আরাধনায়। পাড়ার মোড়ে, রিকশা-অটো স্ট্যান্ডে, জাতপাত ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সামিল হয় সবাই। কোথাও যেন এক সুতোয় সবাইকে রেখে যান বিশ্বকর্মা।
কর্ম-ই ধর্ম আর কোনও কাজই ছোট নয়। সভ্ভতার চাকা সচল রাখতে সমাজে প্রতিটি শ্রমিকের অবদান অপরিসীম। দেবশিল্পীর আরাধনা মানুষের শ্রমশক্তি, মেধা ও কর্মদক্ষতাকেই কুর্নিশ জানায়। তবে যেদিন সমাজে শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হবে এবং প্রতিটি শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার পাবেন, সেদিন হয়তো আমরা সমাজের এই শিথিলতাকে ভোকাট্টা করে দিতে পারবো, হয়তো।