Calcutta Television Network

বর্ষা দেশপান্ডে, তিনদশক ধরে যিনি আগলে রেখেছেন 'দুর্গা'দের

বর্ষা দেশপান্ডে, তিনদশক ধরে যিনি আগলে রেখেছেন 'দুর্গা'দের
13 October 2026 • 12:49:48 pm

ভারতবর্ষ, যে দেশে নারীদের দেবী হিসাবে পূজা করা হয়ে থাকে, সেই দেশের সমাজেই নারীদের ক্ষমতায়ন আর সাম্যের জন্য লড়াই করতে হয়। এদেশে এখনো বেশ কিছু রাজ্যে, কন্যা সন্তানের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখানো হয়। তাদের মতে কন্যাসন্তান জন্মালে তার আলাদা দায়িত্ব থাকে, পড়াশুনা হোক বা না হোক, বিয়ে তাকে দিতেই হবে। আর ভারতের অধিকাংশ গ্রাম বা শহরে পণপ্রথা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ভবিষ্যতের এই বিপুল খরচার হিসেব করে জন্মের আগেই ভ্রূণ থাকাকালীন অনৈতিক ভাবে হত্যা করা হয় কন্যাসন্তান কে। আর এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি বর্ষা দেশপান্ডে, আমাদের আজকের 'দুর্গা', যিনি আরো অনেক দুর্গার ভবিষ্যতকে সুনিশ্চিত করেছেন। 


বর্ষা দেশপান্ডে, মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার একজন আইনজীবী ও সমাজকর্মী, যিনি দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা, নারীদের প্রতি বৈষম্য এবং কন্যা ভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে আপোসহীন লড়াই চালিয়ে গেছেন। সাতারা জেলা থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা শুধু দেশই নয় আন্তর্জাতিক ভাবেও এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। ১৯৯০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'দলিত মহিলা বিকাশ মন্ডল'- যার প্রধান কাজ-ই ছিল সমাজের পিছিয়ে পরা নারীদের আর্থ ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, সঙ্গে সঠিক শিক্ষা ও অধিকারকে সুনিশ্চিত করা। ২০০৪ সালে বর্ষা দেবী 'লেক লাডকি অভিযান' শুরু করেন যার মূল উদেশ্যই ছিল, নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ও যৌতুকপ্রথা কে সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা। তাঁর স্লোগান ছিল, 'Eliminate Inequality, not Women; Destroy Dowry, not Daughters.'

তিনি অবৈধভাবে লিঙ্গ নির্ধারণ পরীক্ষার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নে সফল হয়েছিলেন। ভারতে আশঙ্কাজনকভাবে কন্যা সন্তান হ্রাসের পিছনে এই লিঙ্গ নির্ধারণ ও অবৈধ ভ্রূণ হত্যাকেই দায়ী করেন এবং এর বিরুদ্ধে হওয়া আইনের পদ্ধতিগত ফাঁকফোকরকে পরিকল্পিতভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। গোটা দেশ জুড়ে ৫৬টি গোপন অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন বর্ষা, সেই অভিযান গুলি ছিল অনৈতিক ভাবে লিঙ্গ নির্ধারণ ক্লিনিক গুলির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, সেই সমস্ত ক্লিনিক ও এর সাথে জড়িত ডাক্তার ও ম্যানেজমেন্টের শাস্তিও নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। 


তাঁর এই অসামান্য সাহসিকতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, বর্ষা দেশপান্ডেকে ২০২৫ সালে জাতিসংঘ 'United Nations Population Award'-এ ভূষিত করে। জে আরডি টাটা ও ইন্দিরা গান্ধীর পরে বর্ষা তৃতীয় ভারতীয় নাগরিক যে এই পুরস্কার অর্জন করেছেন। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে জানান, এই সম্মান শুধু তার একার নয়, এই জয় গোটা দেশের সেই সব নারীর যারা এই লড়াই লড়তে বর্ষাকে প্রতিনিয়ত সাহায্য করে গেছেন। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আইনি লড়াই ও অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বারবার। বর্ষা দেশপান্ডে দশভুজা দুর্গা হয়ে রক্ষা করে চলেছেন আরও অনেক দুর্গাকে।