‘নৈতিকতার স্খলন দেখেও, মানবতার পতন দেখেও, নির্লজ্জ অলস ভাবে বইছ কেন?’ সেই কবেই প্রশ্ন করেছিলেন গঙ্গাকে। তারপর কত জল প্রবাহিত হল দুকূল ছাপিয়ে। যাযাবরী জীবন। তবু সেই সুদূর মুম্বাইয়ে গায়িকার গলায় খুঁজে পেয়েছিলেন মাদকতার ছোঁয়া। যেমন খুঁজে পেয়েছিল গোটা ভারতবর্ষ। জীবনের সায়ান্হে শায়িত রোগশয্যায়। একাকী। ভাসছে যৌবনের দিনগুলো। ছায়াসঙ্গিনী কল্পনা লাজমি চালিয়ে দিতেন লতাজির গানগুলো। দীর্ঘ ৪৪ বছরের বন্ধুত্ব। বন্ধু চলে যাওয়ার পরও বারবার বিদ্ধ হয়েছেন লতা। কিন্তু আমৃত্যু বন্ধন ছিল অটুট। তাঁর জন্মদিনে আসামের বুকে বইছে বিভাজনের বিষাক্ত ধোঁয়া। গহীন হলঙের পাতায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে ‘বাংলাদেশী’ দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। বিচার, বৈশিষ্ট, ভাষা সবটুকুই আসছে আতসকাঁচের নিচে। নূন্যতম সন্দেহের অবকাশে পরিগণিত বাংলাদেশি তকমা। ভাঙছে ঘরদোর, উচ্ছেদ হচ্ছে বাসভূমি থেকে। নামও বাদ পড়ছে ভোটার তালিকা থেকে। গন্তব্য কাঁটাতার অভিমুখে। কড়াবেষ্টনীতে প্রহরার দায়িত্বে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। একটি খোঁচায় নির্ধারণ হবে ভাগ্য।
ফিরে যাই ১৯৬০ সাল। গোটা আসাম দগ্ধ হচ্ছে হিংসার আগুনে। অলিতেগলিতে প্রতিধ্বনি, উদ্বাস্তু জনস্রোতের বোঝা আমাদের নয়! এক গায়ক তখন বেছে নিলেন নিজের সামান্য একটি অস্ত্র। ‘দুর্বল মানুহে যদি…’ যে গান পরবর্তীতে বঙ্গানুবাদ হয় শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে, ‘বলো কি তোমার ক্ষতি, জীবনের অথৈ নদী, পার হয়ে তোমাকে ধরে দুর্বল মানুষ যদি?’ ষাটের দশকের উত্তপ্ত আসামে দুফোঁটা বৃষ্টির পরশ এই গান। অসমীয়া ও বঙ্গজীবনের মধ্যিখানে এক অদৃশ্য শাঁকো তৈরী করলেন গায়ক।
আরেক গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। হিংসার বিপরীতে স্বরলিপির পদযাত্রা বেছে নেন প্ৰিয় বন্ধুর সাথে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু শিল্পীরা পা মেলান মিছিলে। সারা দেশে এমন শান্তিযাত্রার প্রতিচ্ছবি তৎকালীন ভারতে বিরল। ওই যাত্রার নাম ছিল, ‘এসো আবার আমরা মিলিত হই’। এই শান্তিযাত্রা চলাকালীন ভূপেন রচনা করেছিলেন বিখ্যাত গান ‘মানুহে মানুহর বাবে’। বাঙালিকে উপহার দিলেন আবারও সেই শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘মানুষ মানুষের জন্য’। প্রবলভাবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। আজকে দাঁড়িয়ে প্রতিমুহূর্তে শিল্পীরা যখন নাগরিক প্রতিবাদের দর্পনে দাঁড়িয়ে বারবার সন্দীহান হন মেরুদন্ডের অস্তিত্ব নিয়ে ভূপেন হাজারিকার সুর তখন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে বারবার।
কলকাতায় আসতেন মাঝেসাঝেই। দেখা করতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনিই প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন লতাজির সঙ্গে। ভূপেনবাবু প্রথম হিন্দী ছবি ‘এক পল’ তৈরী করলেন ১৯৮৬ সালে। লতাকে দিয়ে গাওয়ালেন সবগানগুলি। তবু বহু কাদালেপনের প্রভূত প্রয়াস চলেছে তাঁদের উভয়কে ঘিরে। পাত্তা দেননি উভয়ই। সামাজিক নিকটতম বন্ধুকে সহজ গ্রহণে বারবার বিচ্যুতি দেখা যায় সমাজ নামক সভ্যতায়। তবু যখন বয়স ৮৩। মৃত্যু শয্যায় শিল্পী। লতাজি বার্তা পাঠান প্ৰিয় বন্ধুর জন্য। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন কোকিলকন্ঠী। আরোগ্য কামনা করেছিলেন মঙ্গলময় ঈশ্বরের কাছে। আর শেষ সময়টুকু ওই কেবিনে বাজছিল, ‘এক বুঁদ কাভি পানি কি, মেরি আঁখিয়ো সে বরসায়ে…’