Calcutta Television Network

কেন আজও খোলা হয়নি চিনের প্রথম সম্রাটের সমাধি? রহস্য ঘিরে হাজার প্রশ্ন

কেন আজও খোলা হয়নি চিনের প্রথম সম্রাটের সমাধি? রহস্য ঘিরে হাজার প্রশ্ন
23 September 2026 • 05:42:24 pm

মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস। কত হাজার বছরের পুরোনো। খুঁড়ে চলেছেন, খুঁজে চলেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। খননকার্যের মাধ্যমেই বহু পুরনো সভ্যতা, স্থাপত্য এবং মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে পরিচয়। কিন্তু চিনে আছে এমন একটি ঐতিহাসিক স্থান, যেখানে আজও মাটির নীচে নামার অনুমতি মেলে না সচরাচর। চিনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াঙের সমাধি। চিনের শানসি প্রদেশে লিশান পর্বতের পাদদেশ সংলগ্ন বিশাল এলাকা জুড়ে তৈরি হয় এই সমাধি। মনে করা হয়, সম্রাটের মৃত্যুর বহুকাল আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এই নির্মাণ। প্রায় ৩৮ বছর ধরে কয়েক লক্ষ শ্রমিক নিযুক্ত ছিলেন এই বিশাল সমাধি তৈরির কাজে। তবে সম্রাটের সমাধির কথা প্রথম জনসমাগমে আসে প্রত্নতত্ত্ববিদদের খননকার্য থেকে নয়। ১৯৪৭ নাগাদ কয়েক জন কৃষক ওই এলাকায় কুয়ো খোঁড়ার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। মাটি সরাতে গিয়ে তাঁরা মাটির তৈরি একটি সৈনিকের মূর্তি দেখতে পান। পরে সেটির ভিত্তিতে সেখানে শুরু হয় অনুসন্ধান। একে একে সামনে আসে হাজার হাজার টেরাকোটা সৈনিক। তাঁদের সঙ্গে পাওয়া যায় বেশ কিছু ঘোড়া ও যুদ্ধের রথও।

আজ পর্যন্ত ওই এলাকায় প্রায় ৮০০০ টেরাকোটা সৈনিকের সন্ধান মিলেছে। ধারণা করা হয়, সম্রাটের মৃত্যুর পরের জীবনেও তাঁর রাজ্য এবং সম্পদ রক্ষার্থে তৈরি করা হয়েছিল এই বাহিনী। প্রতিটি মূর্তির গড়ন ও সাজসজ্জায় রয়েছে বিবিধ বৈশিষ্ট্য। তবে সমাধির আসল অংশ এখনও রয়ে গিয়েছে মাটির নীচেই। প্রাচীন চিনা ইতিহাসবিদ সিমা কিয়ানের লেখা ‘শিজি’ বা ‘রেকর্ডস অব দ্য গ্র্যান্ড হিস্টোরিয়ান’-এ সমাধির ভিতরের বেশ কিছু বর্ণনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে বিপুল ধনসম্পদের পাশাপাশি সমাধির ছাদে নক্ষত্র সদৃশ রত্ন সাজানোর কথা বলা হয়েছে। এমনকি চিনের নদী ও ভূখণ্ডের প্রতিরূপও সেখানে নির্মিত হয়েছিল বলে ওই লেখায় উল্লেখ রয়েছে। সমাধির ভিতরে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ কক্ষ থাকার কথাও তখন শোনা যায়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই কাঠামোর আকার সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে। কিন্তু ভিতরে ঠিক কী রয়েছে, তা যদিও এখনও নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। সমাধি না খোলার পিছনে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা নিরাপত্তার। টেরাকোটা সৈনিকগুলি যখন মাটির নীচ থেকে বের করা হয়, তখন দেখা যায় বাতাসের সংস্পর্শে আসার পর তাদের গায়ের রং দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। ফলে আরও খনন করলে সমাধির ভিতরে থাকা বহু প্রাচীন নিদর্শন স্থায়ী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। আরও একটি বড় উদ্বেগ পারদ নিয়ে। প্রাচীন লেখায় সমাধির ভিতরে নদীর মতো করে পারদ ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সমাধির আশপাশের মাটিতেও তুলনামূলক ভাবে অতিরিক্ত মাত্রায় পারদ পাওয়া গিয়েছে। ফলে ভিতরে প্রবেশ করলে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসার একটি আশঙ্কা থেকেই যায়। শুধু বিষাক্ত পদার্থ নয়, প্রাচীন নথিতে সমাধির ভিতরে যান্ত্রিক অস্ত্র থাকার কথাও বলা হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীদের আটকাতেই এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যদিও এত বছর পর সেই অস্ত্রগুলি আদৌ সক্রিয় আছে কি না, তা জানা সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে সমাধিটি একদিকে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ, অন্যদিকে বড় ঝুঁকিরও জায়গা। খননের ফলে যদি ভিতরের কাঠামো বা নিদর্শন কোনোভাবে নষ্ট হয়ে যায়, তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সেই কারণেই চিনের প্রশাসন সমাধির মূল অংশে খননকার্য বন্ধ রেখেছে। চিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিতেও পুরনো নিদর্শন অযথা খনন না করে সেগুলিকে নিজেদের অবস্থানে সুরক্ষিত রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তাই আধুনিক প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতিসাধন না হওয়া পর্যন্ত কিন শি হুয়াঙের সমাধির রহস্য মাটির নীচেই শায়িত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

×
  • CTVN