Calcutta Television Network

তুমি গেছো, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে

তুমি গেছো, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে
14 September 2026 04:25:11 pm

বাংলা কবিতার ব্যতিক্রমী নাম বিনয় মজুমদার, যাঁর সাহিত্যজীবন নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তাঁর ব্যক্তিজীবনকে ঘিরে রহস্যও ততটাই গভীর। পরবর্তীতে তাঁর পুরনো বইপত্রের মধ্যে একটি একটি ডায়েরি পাওয়া যায়। সাথে বেশ কিছু চিঠি। অজানা জীবনের দরজা খানিকটা খুলে ঢুকে আসে একমুঠো খোলা বাতাস।

বিনয়ের সাহিত্যজীবনের শুরুটিও ছিল অন্যরকম। কোনও পত্রিকায় লেখা প্রকাশের আগেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই। ‘নক্ষত্রের আলোয়’। ‘গ্রন্থজগৎ’-এর কর্ণধার দেবকুমার বসু তাঁর লেখা পড়েন ও বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়েও বিনয়ের একাধিক বই বেরোয় এই প্রকাশনা থেকেই। এর মধ্যে অন্যতম ‘ফিরে এসো চাকা’। যাই হোক, কথা হচ্ছিলো খুঁজে পাওয়া ডায়েরি নিয়ে। কাপড়ে মোড়ানো ডায়েরি। পুরোনো বইয়ের সংগ্রহের মধ্যে এককোণে রাখা। বিনয়ের ব্যক্তিগত ডায়েরি। সেখানে কবিতার পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য অঙ্কের হিসাব, গাণিতিক যুক্তি ও নানা সূত্র। অনেক ক্ষেত্রেই সেই অঙ্কগুলির সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট কাজের সম্পর্ক নেই। আবার তারই মধ্যে হঠাৎ উঠে আসা কোনো কবিতার পঙ্‌ক্তি ও খসড়া। উল্লেখ রয়েছে, কোন লেখা কোথায় পাঠানো হয়েছে। ডায়েরির সঙ্গে রাখা বহু মানুষের চিঠি। সেই তালিকায় রয়েছেন বিনয়ের বাবা। রয়েছেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

চিঠিগুলি পড়লে বোঝা যায়, ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর দুর্গাপুরের স্টিল প্রকল্পে প্রশিক্ষণরত বিনয় কলকাতায় ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। সরকারি চাকরি, তবু কাজের পরিবেশ তাঁর পছন্দ হচ্ছিল না। ট্রেনিদের হস্টেলে থাকা, সকাল সকাল কাজে পৌঁছনো এবং নূন্যতম বেতন, সব মিলিয়ে সন্ধান করছিলেন অন্য চাকরির। আবেদনও করেন অন্যত্র।কলকাতায় তৎকালীন তেল সংস্থা এসো এবং জ্ঞান ঘোষ পলিটেকনিকে চাকরির জন্য চিঠি পাঠান। 

তবে পরিবারের সদস্যরা বারংবার সরকারি চাকরি ছাড়ার বিরোধিতা করেছিলেন।  চিঠিতে বিনয়ের বাবা তাঁকে স্থায়ী চাকরির সুবিধার কথা লিখে বোঝান। তাঁর বক্তব্য ছিল, সরকারি চাকরিতে যে নিরাপত্তা রয়েছে তা অন্যত্র কোথায় এবং প্রশিক্ষণ শেষ হলে ছেলেকে যে করে হোক সংসারী করার বাসনাও ছিল তাঁর মনে। দাদাও তাঁকে বেসরকারি সংস্থায় যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেন। তাঁর অভিমত, এমন চাকরিতে টিকে থাকতে যে ধরনের কায়িক পরিশ্রম ও সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়ার দুর্লভ্য ক্ষমতা দরকার, তা বিনয়ের স্বভাবের সঙ্গে একেবারেই খাপ খায় না। পরিবারের কাছ থেকে আশানুরূপ সাহায্য না পেয়ে বিনয় বন্ধুবর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্মরণ নেন। কলকাতায় থাকার জায়গা সন্ধান করতে শক্তির কাছে সাহায্য চান। চিঠিতে শক্তি তাঁকে একটি ঘরের সম্ভাব্য ব্যবস্থা এবং এক বন্ধুর কাছে থাকার বিকল্পের কথাও জানান। একই সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে চাকরি ছেড়ে না দেওয়ার পরামর্শ দেন। এই চিঠিগুলিই দুই কবির সম্পর্কের একটি অন্য ছবি এঁকে দেয়। তাঁরা একই সময়ের কবি, তবু বিনয় কখনোই কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর অংশ ছিলেন না। কিন্তু শক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল নিবিড়। শক্তির চিঠিতে বিনয়ের লেখা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, ‘কৃত্তিবাস’-এর জন্য তাঁর কাছে লেখা চাওয়া এবং একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলা রয়েছে। এমনকি হাংরি আন্দোলনের ভাবনার সূত্র নিয়েও বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ওই চিঠিগুলিতে। শক্তি জানান, বিনয়ের একটি বইয়ের আলোচনা করতে গিয়েই ‘ক্ষুধা’কে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের সাহিত্য আন্দোলনের ভাবনা তাঁর মাথায় আসে। বিনয়ের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গায়ত্রীকে। ‘গায়ত্রীকে’ নামে তাঁর দ্বিতীয় বইয়ে সামান্য কয়েকটিই কবিতা ছিল। বইটির নাম থেকেই গায়ত্রীকে নিয়ে নানা উৎসুক প্রশ্ন তৈরি হয় মানুষের মনে। পরবর্তীকালে অনেকে ধারণা করেন, এই গায়ত্রী সম্ভবত প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী ছাত্রী গায়ত্রী চক্রবর্তী, যিনি আরও পরে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নামে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেন। যদিও তাঁদের পরিচয় ছিল সামান্যই, বিনয়ের মনে তাঁকে ঘিরে গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। শক্তির চিঠিতেও গায়ত্রীর ঠিকানা সংগ্রহের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। বিনয় দুর্গাপুর থেকে তাঁকে ঠিকানা জোগাড় করে দেওয়ার অনুরোধ জুড়েছিলেন। শক্তি একাধিকবার চেষ্টা করার কথা জানিয়েওছেন। অন্য কয়েকজনের কাছেও বিনয় গায়ত্রীর খোঁজ করতেন। 

তবে গায়ত্রীকে ঘিরে আরও একটি সম্ভাবনার কথাও সামনে আসে। বিনয় একসময় হিন্দু হস্টেলে থাকতেন। সেই সময় সেখানকার কর্তৃপক্ষের পরিবারের এক তরুণীর নামও ছিল গায়ত্রী। কিন্তু বয়সের ব্যবধানের কারণে সেই সম্পর্কের গল্প বিশেষ এগোয়নি। ডায়েরির পাতাগুলিও বিনয়ের মানসিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। কোথাও একই ভাবনা বারবার ফিরে এসেছে, কোথাও অসংলগ্ন লেখা। একই পাতায় একদিকে অঙ্কের সূত্র খোদাই রয়েছে, অন্যদিকে বিচ্ছেদ, ভালোবাসা বা হারিয়ে যাওয়ার অতলান্ত কাব্য। কী অদ্ভুত মেলবন্ধন! গণিত ও কবিতা যে পাশাপাশি চলতে পারে, তা একমাত্র বিনয়বাবুই বোধহয় দেখাতে পেরেছেন। পরবর্তী জীবনে বিনয় দীর্ঘ সময় মানসিকভাবে অসুস্থ হন। আশির দশকের শেষ দিকে তাঁকে কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখা যেত। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তায় কখনও মিলত মজার উত্তর, কখনও আবার সেই উত্তর হয়ে উঠত অপ্রত্যাশিত কোনো পংক্তি।

×
  • CTVN