Calcutta Television Network

পুরীর স্নান উৎসব – ঐতিহ্য ও বর্তমান আচার

পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দির ভারতের চারধাম তীর্থের অন্যতম। এখানে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমায় পালিত হয় স্নান উৎসব বা দেব স্নান পূর্ণিমা। স্কন্দ পুরাণ অনুসারে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রথমবার কাঠের মূর্তি স্থাপন করার পর এই স্নান অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলেন। এই দিনটিকে ভগবান জগন্নাথের জন্মদিন হিসেবেও ধরা হয়। উৎসবের মূল আচারগুলির সঙ্গে ওড়িশার আদিবাসী ঐতিহ্যের যোগ রয়েছে। দইতা ও সবর সম্প্রদায়ের পুরোহিতরা আজও এই উৎসব পরিচালনার বিশেষ অধিকার রাখেন। 

প্রধান আচার  

স্নান উৎসবের দিনে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শনকে মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বের করে স্নান মণ্ডপে আনা হয়। ভক্তরা এই ‘পাহান্ডি বিজয়’ শোভাযাত্রা প্রত্যক্ষ করেন। এরপর দেবতাদের ১০৮ কলস পবিত্র জলে স্নান করানো হয়। এই জল সংগ্রহ করা হয় মন্দিরের উত্তর দিকের ‘সোনা কুয়া’ থেকে। স্নানের পর দেবতাদের গজবেশ বা হাতির সাজে অলঙ্কৃত করা হয়, যা ভগবান গণেশের রূপের প্রতীক।  

বিশ্রামকাল  

স্নানের পর দেবতাদের অসুস্থ বলে মনে করা হয়। ঠান্ডা জলে স্নানের কারণে তাঁরা জ্বরাক্রান্ত হন বলে বিশ্বাস। তাই তাঁরা ১৪–১৫ দিনের জন্য জনদর্শন থেকে বিরত থাকেন। এই সময়ে তাঁদেরকে সাধারণ ভোগ না দিয়ে ফল, ছেনা ও আয়ুর্বেদিক লাড্ডু প্রদান করা হয়। রাজ বৈদ্য তাঁদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। ভক্তরা এই সময়ে পুরীর পরিবর্তে ব্রহ্মগিরির আলর্ণাথ মন্দিরে দর্শন করতে যান, কারণ বিশ্বাস করা হয় ভগবান জগন্নাথ সেখানে আলর্ণাথ রূপে প্রকাশিত হন।  

বর্তমান আয়োজন  

আজও স্নান উৎসব পুরীতে মহাসমারোহে পালিত হয়। হাজার হাজার ভক্ত ভোর থেকে মন্দিরে ভিড় করেন। প্রশাসন নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সিসিটিভি নজরদারি, পুলিশ বাহিনী, মেরিন সিকিউরিটি—সবই থাকে যাতে অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। উৎসব শেষে দেবতারা অনসরে প্রবেশ করেন এবং রথযাত্রার আগের দিন পুনরায় জনদর্শনে আসেন। 

পুরীর স্নান উৎসব ভগবান জগন্নাথের আধ্যাত্মিক মহিমার এক অনন্য প্রকাশ। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং ওড়িশার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। স্নান, গজবেশ, অনসরের মতো আচারগুলি ভক্তদের মনে ভগবানের মানবীয় রূপের অনুভূতি জাগায়। রথযাত্রার আগে এই উৎসব ভক্তদের জন্য এক বিশেষ প্রস্তুতির মুহূর্ত, যা পুরীর আধ্যাত্মিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে।  


শেয়ার করুন