Calcutta Television Network

ঘূষ্মেশ্বর, এক নারীর ভক্তিতে জাগ্রত হলেন মহাদেব! বারো জ্যোতির্লিঙ্গের রহস্যময়তম অধ্যায়...

বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে কম পরিচিত, অথচ সবচেয়ে মহিমাময় মন্দির হল ঘূষ্মেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ, যা মহারাষ্ট্রের ইলোরা গুহার কাছে অবস্থিত। এই মন্দির শুধু শিবের পবিত্র আবাসস্থল নয়, এখানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানান রকম গল্প, যা আজও অনুপ্রাণিত করে লক্ষ লক্ষ ভক্তকে। 

শিবপুরাণে বর্ণিত রয়েছে একটি অলৌকিক কাহিনী। এখন আমরা সেটাকে নিয়েই আলোচনা করবো। একজন সতী নারীর নাম ঘূষ্মা। স্বামী হারানোর পরেও তিনি অবিচলিত ভক্তি নিয়ে শিবের পূজায় ব্রতী ছিলেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি ১০১টি শিবলিঙ্গ মাটি দিয়ে গড়ে গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে পূজার্চনা করতেন। শিবের নাম জপে তিনি সবকিছু ভুলে থাকতেন। একদিন তাঁর ঈর্ষান্বিত আত্মীয়রা তাঁর পুত্রকে হত্যা করে দেহ গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু ঘূষ্মা ভক্তি থেকে বিচ্যুত হলেন না। তিনি শিবের ধ্যানে অটল রইলেন। তাঁর এই ভক্তি দেখে মহাদেব স্বয়ং আবির্ভূত হলেন, ঘূষ্মার পুত্রকে ফিরিয়ে দিলেন, এবং বললেন, 'তোমার নামে এখানে আমার লিঙ্গ পূজিত হবে। আমার নাম হবে ঘূষ্মেশ্বর।' এইভাবে জন্ম নেয় ঘূষ্মেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ। 

ঘূষ্মেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ শিবের করুণা, ক্ষমাশীলতা ও ভক্তির প্রতিদান এর প্রতীক। বিশ্বাস করা হয়, এখানে পূজা করলে সন্তানসুখ ও পারিবারিক শান্তি মেলে। ঘূষ্মার মতো ভক্তি নিয়ে শিবের নাম জপ করলে জীবনের সব দুঃখ দূর হয়। 

ঘূষ্মেশ্বর মন্দির মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদ জেলার ইলোরা গুহার কাছে অবস্থিত। মন্দিরটি প্রাচীন যুগের স্থাপত্যে নির্মিত, কিন্তু ইতিহাসে বহুবার এর সংস্কার হয়েছে। গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গটি অত্যন্ত পবিত্র এবং শিবের সঙ্গে ঘূষ্মার নাম অম্লানভাবে জড়িয়ে আছে। মন্দিরে আছে এক বিশাল প্রাঙ্গণ, নন্দী মণ্ডপ এবং শিলালিখিত শ্লোক। 

ইলোরা গুহার নিকটে হওয়ায় এটি পর্যটকদের কাছেও বেশ আকর্ষণীয়। মন্দিরের চারপাশে অসংখ্য প্রাচীন ভাস্কর্য ও শিলাস্তম্ভ রয়েছে। 

এই মন্দিরের বিশেষত্ব হল-এটি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত ইলোরা গুহা সংলগ্ন অঞ্চলে, যা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান। ইলোরা গুহায় যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপত্যের সমন্বয় দেখা যায়, ঘূষ্মেশ্বর মন্দিরও ঠিক তেমন বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। 

মহাশিবরাত্রি, এখানে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। হাজার হাজার ভক্ত মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় জমা হয়।

শ্রাবণ মাসে প্রতিদিন গঙ্গাজল দিয়ে শিবলিঙ্গ স্নান, এমনকি শ্রাবণ মাস উপলক্ষ্যে বিশেষ পুজো ও রুদ্রাভিষেকও হয়। ঘূষ্মার কাহিনী স্মরণে নারীরা বিশেষ ব্রত পালন করেন। 

ঘূষ্মেশ্বর মন্দিরে যাচ্ছেন! গেলে অবশ্যই ঘুরে দেখুন চারপাশ। একবার গেলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাবেন।  ঘূষ্মেশ্বর মন্দির দর্শনের পাশাপাশি ইলোরা গুহা ভ্রমণ করা উচিত। এছাড়াও এর নিকটে রয়েছে- দৌলতাবাদ দুর্গ, অজন্তা গুহা, বিবি কা মাকবরার ঐতিহাসিক সৌধ। 

এবার বলি কীভাবে পৌঁছাবেন ঘূষ্মেশ্বর মন্দিরে। মন্দিরের নিকটতম শহর আওরঙ্গাবাদ (৩০ কিমি), নিকটতম রেলস্টেশন আওরঙ্গাবাদ, নিকটতম বিমানবন্দর আওরঙ্গাবাদ বিমানবন্দর। আওরঙ্গাবাদ থেকে ট্যাক্সি বা বাসে সহজেই পৌঁছানো যায়। 

ঘূষ্মেশ্বরের মাহাত্ম্য আমাদের শেখায়—অটল বিশ্বাস সব বাধা জয় করে। ঘূষ্মা যে কষ্টেও ভক্তি ত্যাগ করেননি, সেই কাহিনী আজও নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মহাদেব এখানে ভক্তির সঠিক মর্যাদা দিয়েছেন। 

মহারাষ্ট্রের এই অঞ্চলে প্রচলিত খাবার হল—ভাকরি, পিটলা, আমটি, এবং নানা রকম মিষ্টি। তীর্থযাত্রার সময়ে ভক্তদের জন্য প্রবাসী আশ্রম নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা থাকে। 

ঘূষ্মেশ্বর শুধু একটি জ্যোতির্লিঙ্গ নয়, এখানে নারীশক্তি বিরাজমান, অটল ভক্তি ও শিবের আশীর্বাদের প্রতীক।

শেয়ার করুন