Calcutta Television Network

রামেশ্বরম, রাম ও শিবের পবিত্র মিলনভূমি—রামায়ণের সেতু থেকে মহাশিবরাত্রির আলোকোজ্জ্বল রাত...

ভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে অবস্থিত রামেশ্বরম, একটি নাম যা উচ্চারণমাত্রই জাগায় ভক্তির স্রোত। তামিলনাড়ুর এই শহরটি শুধু হিন্দুদের বারো জ্যোতির্লিঙ্গের একটি নয়, বরং এটি চারধামের অন্যতম পবিত্র স্থান। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে ভক্তি, ইতিহাস ও রহস্যের ত্রিবেণী মিলিত হয়েছে। বিশ্বাস করা হয়—রামেশ্বরম দর্শন ছাড়া হিন্দুর তীর্থযাত্রা অপূর্ণ থাকে।

রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে লঙ্কাকাণ্ড পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে রামের ধর্মনিষ্ঠা ও ভক্তির পরিচয় মেলে। রাম যখন রাবণকে বধের সংকল্প নেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে রাবণ কেবল একজন রাজা নন, বরং তিনি ছিলেন শিবের পরম ভক্ত। রাবণবধের আগে রাম শিবের কৃপা লাভ করতে চাইলেন। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে শিবের কোনও বিশিষ্ট মন্দির না থাকায় রাম সিদ্ধান্ত নিলেন—এখানে তিনি শিবলিঙ্গ স্থাপন করবেন। 

রাম হনুমানকে পাঠালেন কাশী থেকে শিবলিঙ্গ আনতে। কিন্তু তিনি ফিরতে দেরি করছিলেন। তখন মা সীতা সমুদ্রের বালু দিয়ে একটি শিবলিঙ্গ তৈরি করলেন। রাম সেই লিঙ্গেই পূজা করলেন। এই লিঙ্গ আজও মন্দিরে পূজিত হয় 'রামনাথস্বামী লিঙ্গ' নামে। পরে হনুমান আনা লিঙ্গকেও মন্দিরে স্থাপন করা হয়, যা হনুমেশ্বর লিঙ্গ নামে পরিচিত। 

এই কাহিনী প্রমাণ করে—রামায়ণ শুধু যুদ্ধ ও বীরত্বের কাহিনী নয়, এটি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণেরও কাহিনী। শিবপুরাণ অনুসারে— 'রামেশ্বরম দর্শনেই সকল পাপ নাশ হয় এবং মোক্ষ লাভ হয়।' এখানে পূজা করলে— জীবনের পাপ মোচন হয়। পারিবারিক শান্তি বজায় থাকে। শিব ও রামের যুগল আশীর্বাদে জীবন শুভ হয়। হিন্দুদের জন্য রামেশ্বরম দর্শন মানে জীবনের পরম পূণ্যলাভ। 

রামনাথস্বামী মন্দির দ্রাবিড় স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। মন্দিরের করিডর ৬৩৩ মিটার দীর্ঘ—বিশ্বের দীর্ঘতম করিডরের অন্যতম। করিডরের ছাদে রয়েছে সূক্ষ্ম ভাস্কর্য ও রঙিন অলঙ্করণ। মন্দিরের মধ্যে রয়েছে ৬৪টি পবিত্র তীর্থকূপ, যেগুলির জল পাপমোচনকারী বলে বিশ্বাস করা হয়। গর্ভগৃহে রয়েছে রামনাথস্বামী লিঙ্গ এবং হনুমান আনা লিঙ্গ।

রামেশ্বরমের কাছে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত রামসেতু (আদমস ব্রিজ)। রামায়ণ অনুসারে, রামের সেনাপতি নল ও নীল সমুদ্রের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করেছিলেন, যার উপর দিয়ে রাম ও তাঁর সেনা নিয়ে লঙ্কায় গিয়েছিলেন। 

বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে সমুদ্রের তলায় পাথরের সারি, যা ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝে সংযোগ তৈরি করেছে।  যদিও বিজ্ঞানীরা বলেন এটি প্রাকৃতিক গঠন, ভক্তরা বিশ্বাস করেন এটি রামসেতুরই অবশিষ্টাংশ। 

মহাশিবরাত্রিতে রামনাথস্বামী মন্দিরে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয়। এছাড়াও কার্তিক মাসের দীপোৎসবে সমুদ্রতীরে প্রদীপের আলোয় এক স্বর্গীয় দৃশ্য তৈরি হয়। ভক্তরা উত্তর ভারতের গঙ্গাজল এনে শিবলিঙ্গে স্নান করান। সন্তানসুখ ও পরিবারিক শান্তির জন্য ভক্তরা ব্রত পালন করেন।

 রামেশ্বরমের চারপাশে রহস্যে ভরা। ধনুষ্কোটি বলে একটি জায়গা আছে, যেটি রামসেতুর শেষ প্রান্ত। এখন এটি ভূতুড়ে শহর নামে পরিচিত, কারণ ১৯৬৪ সালে সাইক্লোনে ধ্বংস হয়েছিল। আছে কোথান্দরামস্বামী মন্দির, যেখানে বিভীষণ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এখানে আছে পামবান ব্রিজ, ভারতীয় রেলপথের সবচেয়ে আইকনিক সেতুগুলির একটি। এছাড়াও আছে অগ্নি তীর্থ, সমুদ্রের তীরের পবিত্র স্নানের স্থান। 

এবার আসি এখানে কীভাবে যাবেন? বিমানপথে যেতে পারেন। মাদুরাই বিমানবন্দর থেকে ১৭০ কিমি দূরত্ব। আবার রেলপথেও যেতে পারেন, রামেশ্বরম স্টেশন ভারতের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও সড়কপথেও যাওয়া যেতে পারে। চেন্নাই, মাদুরাই থেকে সহজেই বাস ও ট্যাক্সি পাওয়া যায়। 

তামিলনাড়ুর বিশেষ নিরামিষ ভোজন—ইডলি, ডোসা, সাম্বর, নারকেল চাটনি—ভক্তদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। মন্দিরে প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয় পঞ্চামৃত ও নারকেল। 

লোককথায় শোনা যায়—মন্দিরের কূপের জলে নাকি ভূগর্ভস্থ গঙ্গার সংযোগ রয়েছে। পুজোর সময় যদি ঘণ্টাধ্বনি স্পষ্ট হয়, তা নাকি শিবের আশীর্বাদের লক্ষণ। রামসেতুর কাছে গভীর সমুদ্রে নাকি এখনও ভাসমান পাথরের চিহ্ন পাওয়া যায়। 

রামেশ্বরম শুধু একটি মন্দির নয়, এটি আধ্যাত্মিকতার অনন্য কেন্দ্র। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়—শক্তি ও ভক্তি, শিব ও রাম একসূত্রে বাঁধা। হিন্দু জীবনে রামেশ্বরমের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে আসা মানেই এক অনন্য শান্তি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

শেয়ার করুন