Calcutta Television Network

নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ, দ্বারকার সমুদ্রতীরে শিবের সর্পময় আসন!

গুজরাট মানেই কৃষ্ণের দ্বারকা, বৈষ্ণব ভক্তির এক মহাতীর্থ। কিন্তু দ্বারকার কাছেই রয়েছে শৈবধর্মের এক অনন্য পীঠ, নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ। বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এই মন্দিরকে ঘিরে আছে প্রাচীন পুরাণকথা, অদ্ভুত রহস্য এবং গভীর আধ্যাত্মিকতা। আজও হাজার হাজার ভক্ত সমুদ্রের হাওয়ায় ভেসে এই মন্দিরে এসে ধ্যানমগ্ন হন মহাদেবের সামনে।

নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক চমকপ্রদ পুরাণকথা, যা শিবপুরাণে বর্ণিত। প্রাচীন কালে সমুদ্রের ধারে ছিল এক অরণ্য, নাম দারুকাবন। সেই বনে বাস করত দারুকা নামের এক অসুর এবং তার স্ত্রী দারুকী। তারা কঠোর তপস্যা করে দেবতাদের কাছ থেকে অসীম শক্তি অর্জন করেছিল। এই শক্তির অপব্যবহার করে তারা ঋষি-মুনি ও সাধুদের বন্দি করতে শুরু করে। বন্দি হওয়া ঋষিরা শিবের কাছে প্রার্থনা করলেন—'হে মহাদেব, আমাদের উদ্ধার করুন।'

ভক্তদের আহ্বানে শিব সেই বনে আবির্ভূত হন এবং দারুকা দানবকে বধ করেন। তারপর ভক্তদের অনুরোধে শিব চিরকাল এখানে জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে অবস্থান করেন। তখন থেকেই এই স্থান নাগেশ্বর নামে পরিচিত হয়—‘নাগ’ অর্থাৎ সাপ এবং ‘ঈশ্বর’ অর্থাৎ শিব, যিনি সাপের অধিপতি। 

শিবের গলায় জড়ানো সর্পের মাহাত্ম্য হিন্দুধর্মে অপরিসীম। সাপ এখানে শক্তি, নিয়ন্ত্রণ এবং ভয়কে জয়ের প্রতীক। তাই নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গকে মনে করা হয় শিবের নাগভূষিত রূপের প্রতীক। 

দ্বারকা থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ অবস্থিত। মন্দিরের চারপাশে রয়েছে খোলা প্রান্তর, আর দূরে গর্জনরত আরব সাগরের ঢেউ। সমুদ্রের হাওয়ার সঙ্গে মন্দিরের ঘণ্টার ধ্বনি মিলিয়ে তৈরি হয় এক অলৌকিক আবহ, যা ভক্তদের মনে গভীর শ্রদ্ধা জাগায়। 

বর্তমান নাগেশ্বর মন্দির একটি অভিজাত আধুনিক স্থাপত্য, তবে এর অন্তরে রয়েছে সেই প্রাচীন জ্যোতির্লিঙ্গ। মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ২৫ মিটার, গায়ে সাদা রঙের গম্বুজ। মন্দিরের বাইরে রয়েছে ৮০ ফুট উঁচু মহাদেবের বিশাল মূর্তি, যা দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। গর্ভগৃহে স্থাপিত শিবলিঙ্গটি কালো পাথরের, যা সর্বদা পূজা ও আরতিতে আলোকোজ্জ্বল। 

নাগেশ্বর মন্দিরে মহাশিবরাত্রি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিনে হাজার হাজার ভক্ত দ্বারকা থেকে পায়ে হেঁটে নাগেশ্বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সারারাত ভজন, কীর্তন, মহাদেবের আরতি চলে। এছাড়া শ্রাবণ মাসে ভক্তদের ভিড় থাকে উপচে পড়া। পূজার্চনা, বিল্বপত্র অর্পণ, গঙ্গাজল স্নান – সব মিলিয়ে উৎসবের আবহে মন্দির প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

শাস্ত্র মতে, নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গে দর্শন করলে ভক্তরা পাপমুক্ত হন এবং মুক্তিলাভ করেন। বিশ্বাস করা হয়—সাপের ভয় বা নাগদোষ দূর হয়। শত্রুর বিনাশ হয়। ভয় ও অশুভ শক্তি থেকে মুক্তি মেলে। এই মন্দিরে দাঁড়িয়ে ভক্তরা অনুভব করেন এক অদ্ভুত শান্তি ও নিরাপত্তা। 

এবার বলি কীভাবে পৌঁছাবেন নাগেশ্বর? এর নিকটতম শহর দ্বারকা  এবং রেলস্টেশন দ্বারকা (প্রধান শহর থেকে নিয়মিত ট্রেন পরিষেবা)। বিমানবন্দর: জামনগর (প্রায় ১৪০ কিমি দূরে) দ্বারকা থেকে নাগেশ্বর মন্দিরে সহজেই ট্যাক্সি বা বাসে পৌঁছানো যায়। 

গুজরাটের রঙিন সংস্কৃতি নাগেশ্বর ভ্রমণকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। স্থানীয় লোকসংগীত, নৃত্য, ও পুষ্পসজ্জা ভক্তদের মন ভরিয়ে দেয়। খাবারের মধ্যে গুজরাটি থালি, ঢোকলা, থেপলা – সবই জনপ্রিয়। 

নাগেশ্বর দর্শনের পর অবশ্যই দেখতে পারেন—দ্বারকাধীশ মন্দির – কৃষ্ণের মহাপবিত্র স্থান, বেত দ্বারকা দ্বীপ, গোমতী ঘাট, রুক্মিণী মন্দির। এছাড়াও আরব সাগরের সূর্যাস্ত ভ্রমণকে অবিস্মরণীয় করে তোলে। 

বিকেলের শেষে যখন আরব সাগরের ঢেউ লালচে আলোয় ঝলমল করে, তখন মনে হয় শিব ধ্যানমগ্ন হয়ে বিশ্বজগতের শান্তির বার্তা দিচ্ছেন। সেই দৃশ্য ভক্তদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকে। 

নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ শুধু একটি মন্দির নয়, এটি এক চিরন্তন বিশ্বাসের প্রতীক। শিবের অলৌকিক উপস্থিতি, সমুদ্রের অনন্ত সৌন্দর্য এবং দ্বারকার ইতিহাস মিলে এই তীর্থকে করেছে ভারতের আধ্যাত্মিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি কেউ যদি জীবনে একবার নাগেশ্বরে না যায়, তবে তার জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। 

শেয়ার করুন