Calcutta Television Network

কাশী বিশ্বনাথ, শিবের অনন্ত মহিমা... যেখানে সময় থেমে থাকে গঙ্গার স্রোতের পাশে!

বারাণসী, বা কাশী, শুধু একটি শহর নয়—এটি হিন্দুধর্মের আধ্যাত্মিক হৃদয়। গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন নগরীতে সময় যেন থেমে গেছে। আর এই নগরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন মহাদেব স্বয়ং কাশী বিশ্বনাথ রূপে। এখানে এসে ভক্তরা বিশ্বাস করেন—জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। শাস্ত্র বলে, 'কাশী বিশ্বনাথ দর্শন ছাড়া মোক্ষ লাভ অসম্ভব।' 

শিব পুরাণে বলা আছে—কাশী কখনও ধ্বংস হবে না, কারণ এটি মহাদেবের প্রিয় ভূমি। কথিত আছে, মহাদেব নিজে বিশ্বনাথ রূপে এখানে আবির্ভূত হন ভক্তদের মুক্তি দানের জন্য। অন্য এক কাহিনী অনুসারে, অন্নপূর্ণা দেবী এখানে মহাদেবকে আহার দেন। তাই কাশী শুধু শিবের তীর্থ নয়, এটি অন্নপূর্ণা শক্তির কেন্দ্রও। বিশ্বাস করা হয়, মৃত্যুকালে যদি কারও কানে শিবের নাম ধ্বনিত হয়, তবে তার মুক্তি নিশ্চিত। তাই মৃত্যুর আগে মানুষ কাশীতে এসে শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে চায়।

বারো জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে কাশী বিশ্বনাথ সর্বাধিক পূজিত ও সম্মানিত। শাস্ত্র মতে—'কাশী বিশ্বনাথ দর্শন করিলে সর্বপাপ বিনাশ হয়।' এই মন্দিরের গর্ভগৃহে কালো পাথরের শিবলিঙ্গ বিরাজমান, যার মাহাত্ম্য অপরিসীম। 

বর্তমান কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ১৮শ শতকে রানি অহল্যাবাই হোলকর নির্মাণ করেন। মন্দিরের চূড়ায় রয়েছে ৮০০ কেজি খাঁটি সোনা, যা মন্দিরকে দিয়েছে এক অনন্য জৌলুস। মূল মন্দিরের চারপাশে রয়েছে ছোট ছোট শিবমন্দির ও দেবমূর্তি। মন্দিরের ভিতর প্রবেশের আগে গঙ্গাস্নান ভক্তদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, এই মন্দির বহুবার ধ্বংস হয়েছে—বিশেষ করে মুঘল আমলে। পরে পুনর্নির্মাণ করে আজকের রূপ দেওয়া হয়।

কাশী বিশ্বনাথের মাহাত্ম্য শুধু মন্দিরে সীমাবদ্ধ নয়। মন্দিরের পাশে গঙ্গার স্রোত যেন শিবের চরণধূলিতে ধন্য। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, গঙ্গায় স্নান করে বিশ্বনাথ দর্শন করলে সব পাপ মুছে যায়।

বিশ্বনাথ মন্দিরে মহাশিবরাত্রি এক মহোৎসব। সেই রাতে শহর আলোয় আলোকিত হয়, শিবের নামগান ধ্বনিত হয় প্রতিটি ঘাটে। শ্রাবণ মাসে লাখো ভক্ত কাবাড়ি নিয়ে আসেন, তারা গঙ্গাজল দিয়ে বিশ্বনাথকে অভিষেক করেন। এছাড়া প্রতিদিনের গঙ্গা আরতিও কাশীর অন্যতম আকর্ষণ।

হিন্দু বিশ্বাস মতে, কাশীতে মৃত্যু মানে মোক্ষ। কারণ এখানে শিব নিজে মৃত্যুর কানে তারক মন্ত্র উচ্চারণ করেন। এজন্যই কাশীকে বলা হয় 'মহামোক্ষক্ষেত্র'। বিশ্বনাথ মন্দিরের চত্বরে দাঁড়িয়ে মনে হয়—মানুষের জীবনের সমস্ত অহংকার, ভয়, লোভ মিলিয়ে যায়। শুধু থাকে ভক্তি আর শান্তি। 

এবার বলি কীভাবে পৌঁছাবেন কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে? এই মন্দিরের নিকটতম রেলস্টেশন হল বারাণসী (Varanasi Junction) এবং বিমানবন্দর হল লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বিমানবন্দর (২২ কিমি দূরে)। 

কাশীর খাবার যেমন বিখ্যাত, তেমনি এর সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ। এখানে প্রসাদ হিসাবে দেওয়া হয় লাড্ডু, পেঁড়া আর স্ট্রিট ফুড হিসাবে পাওয়া যায় কচুরি-সাবজি, টমেটর চাট। এছাড়াও মিষ্টিতে পাওয়া যায়, মালাইও, লাল পেড়া। এছাড়াও গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যার সময় সঙ্গীতানুষ্ঠান কাশীর সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখে। 

বিশ্বনাথ দর্শনের পর অবশ্যই দেখতে হবে—দশাশ্বমেধ ঘাট (গঙ্গা আরতির জন্য বিখ্যাত), সঙ্কটমোচন হনুমান মন্দির, অন্নপূর্ণা দেবী মন্দির, সারনাথ (বৌদ্ধতীর্থ)। 

গঙ্গার তীরে সূর্যোদয় দেখা মানে এক অদ্ভুত শান্তি। সেই মুহূর্তে কাশী মনে হয় যেন দেবতাদের আবাসভূমি। 

কাশী বিশ্বনাথ শুধু একটি মন্দির নয়—এটি বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু, মুক্তির চাবিকাঠি। বারো জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে এটি সবচেয়ে পূজিত এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় তীর্থ। জীবনে একবার হলেও কাশী গিয়ে বিশ্বনাথ দর্শন না করলে শিবভক্তির পূর্ণতা আসে না। 

শেয়ার করুন