Calcutta Television Network

ভীমাশঙ্কর, সাহ্যাদ্রির সবুজে জ্যোতির্লিঙ্গের মহিমা! শিব ও ভক্তির অমৃতকথা...

মহারাষ্ট্রের সাহ্যাদ্রি পর্বতমালার বুক চিরে, ঘন অরণ্যের গভীরে রয়েছে এক তীর্থস্থান যা শুধু ভক্তির কেন্দ্র নয়, প্রকৃতির কোলে আশ্চর্য এক শান্তিধাম—ভীমাশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ। হিন্দু ধর্মের বারো জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এই মন্দির আজও ইতিহাস, পুরাণ এবং প্রাকৃতিক বিস্ময়ের মিলনস্থল হয়ে রয়েছে। 

প্রতিদিন হাজারো ভক্ত আসেন এখানে, শুধু পুজো দিতে নয়, অনুভব করতে—এক এমন শক্তি যা যুগ যুগ ধরে দেবতা ও মানুষের আশ্রয় হয়ে রয়েছে। 

হিন্দু শাস্ত্রে বর্ণিত রয়েছে ভীমাশঙ্করের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক চমকপ্রদ কিংবদন্তি। কথিত আছে, কুম্ভকর্ণের পুত্র ভীম ছিল এক অত্যাচারী রাক্ষস। সে তপস্যা করে ব্রহ্মার বরলাভ করেছিল। সেই শক্তির জোরে সে দেবতা ও ঋষিদের ওপর অসহ্য অত্যাচার শুরু করে। 

দেবতারা শেষপর্যন্ত শরণ নেন মহাদেবের কাছে। শিব ভক্তদের কষ্ট দেখে ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি এই সাহ্যাদ্রির ঘন জঙ্গলে অবতীর্ণ হন এবং রাক্ষস ভীমকে বধ করেন। রাক্ষস বধের পর ভক্তরা মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করেন, 'হে মহাদেব, আপনি চিরকাল এখানে বিরাজ করুন।' 

তখনই শিব জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠিত হন এই পাহাড়ি অরণ্যে। সেই থেকে এই স্থান পরিচিত হয় ভীমাশঙ্কর নামে—দানব ভীমের বিনাশের স্মৃতি ধরে রাখতে। 

শিবপুরাণ অনুসারে, জ্যোতির্লিঙ্গ হল মহাদেবের অনন্ত শক্তির প্রতীক, যা আলোকরূপে প্রকাশিত। বিশ্বাস করা হয়, এই ১২টি স্থানে শিব নিজে আলোকস্তম্ভ রূপে প্রকাশিত হয়েছিলেন। ভীমাশঙ্কর সেই পবিত্র স্থানের একটি, যা পূজিত হয় অষ্টম জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে।

ভীমাশঙ্কর শুধু একটি মন্দির নয়, এটি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের ঠিকানা। সাহ্যাদ্রি পর্বতমালার কোলে ঘন জঙ্গল, মেঘে ঢাকা পাহাড়, ঝরনার কলকল ধ্বনি—সব মিলিয়ে এটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক স্বর্গতুল্য স্থান। 

এই অরণ্যেই অবস্থিত ভীমাশঙ্কর বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য, যেখানে পাওয়া যায় বিরল প্রাণী যেমন জায়ান্ট স্কুইরেল (শেফালি)। এখানে আসলেই মনে হয় যেন আপনি এক রহস্যময় জগতে প্রবেশ করেছেন।

ভক্তদের মতে, শিব যখন ভীমকে বধ করেন, তখন তাঁর শরীর থেকে ঘাম ঝরে গিয়েছিল এবং সেই ঘাম থেকেই জন্ম নেয় ভীমা নদী। এই নদী পরে কৃষ্ণা নদীর সঙ্গে মিশে যায়। তাই ভীমাশঙ্করকে শুধু তীর্থ নয়, একটি প্রকৃতির উৎসস্থল বললেও ভুল হবে না।

ভীমাশঙ্কর মন্দিরের স্থাপত্য মধ্যযুগীয় নাগরশৈলীতে নির্মিত। পাথরের খোদাই করা স্তম্ভ, গর্ভগৃহের সরলতা এবং মন্দিরের শিখর এক অপূর্ব মিশ্রণ।

গর্ভগৃহে স্থাপিত শিবলিঙ্গ ছোট হলেও তা অত্যন্ত শক্তিশালী ও পবিত্র বলে মানা হয়। 

মন্দিরের চারপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট শিবমন্দির, যেগুলি ভক্তি ও স্থাপত্যকলার উদাহরণ। 

ভীমাশঙ্করে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় শ্রাবণ মাসে। এই সময় হাজার হাজার ভক্ত এখানে আসেন, শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল ও ফুল অর্পণ করতে। মহাশিবরাত্রি-তে ভীমাশঙ্করের পবিত্রতা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। রাতভর আরতি, মন্ত্রপাঠ ও ভজনের ধ্বনি পাহাড়ি অরণ্যে প্রতিধ্বনিত হয়।

শিবের এই রূপ শুধু দানব বিনাশী নন, ভক্তদের রক্ষকও। ভীমাশঙ্করে পুজো করলে জীবনের সমস্ত সংকট দূর হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়া ভক্তরা মনে করেন, এখানে শিবকে প্রার্থনা করলে কর্মফল হ্রাস হয় এবং মুক্তির পথ সুগম হয়। 

এবার আসি কীভাবে পৌঁছাবেন ভীমাশঙ্কর মন্দিরে! ভীমাশঙ্করের নিকটবর্তী শহর পুনে (প্রায় ১০০ কিমি দূরে), এবং নিকটবর্তী রেলস্টেশন পুনে। নিকটতম বিমানবন্দর: পুনে এয়ারপোর্ট। এখানে যাওয়ার জন্য সড়কপথে গাড়ি ভাড়া করতে পারেন। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উঠতে হয়, তাই ভ্রমণ হবে রোমাঞ্চকর।

ভীমাশঙ্করের পথে রয়েছে মনোরম ট্রেকিং রুট। প্রকৃতিপ্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য এই ট্রেক এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। পথে ঝরনা, পাহাড়, জঙ্গলের দৃশ্য চোখে শান্তি এনে দেয়।

ভীমাশঙ্কর এমন একটি তীর্থ যেখানে ভক্তি, পুরাণ, ইতিহাস এবং প্রকৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়— 'শিব শুধু জ্যোতির্লিঙ্গে নন, শিব আছেন বাতাসে, নদীর স্রোতে, গাছের পাতায়।'

শেয়ার করুন