'সেদিন মাঠ চাষ করতে গিয়ে কোদালে টুং করে একটা শব্দ হয়...!' ঘটনাটি ঘটেছে বাঁকুড়ার ছাতনা ব্লকের একটি ছোট্ট গ্রামে। গ্রামের নাম ‘কুড়িমুড়া’। সেখানে চাষ করতে গিয়ে স্থানীয় কৃষক হরিপদ গোস্বামী এক আশ্চর্য জিনিস খুঁজে পান। তাঁর কোদালে উঠে আসে একটি কালো, চকচকে, গম্বুজ আকৃতির পাথর — যা পরে ধুয়ে-মুছে স্পষ্ট হয় — একটি প্রাচীন শিবলিঙ্গ!
গ্রামের লোক বলছে, এই জমিতে বহুদিন ধরেই কেউ ফসল ফলাতে পারত না। তারা বলত, 'এই মাটি জাদু খায়... যা ফেলে দাও, তা ফিরে আসে।' কেউ এই জমি বিক্রি করতে চেয়েছে, কেউ আবার বলেছে, রাতে এখানে ধূপ-ধুনোর গন্ধ ভেসে আসে। তবে কেউ জানত না, মাটির নিচে সত্যিই একটা কিছু আছে।
হরিপদবাবুর নিজের কথায়, 'আমি যখন কোদাল মারি, তখন মনে হয় লোহার কিছুর সঙ্গে লাগল। মাটি পরিষ্কার করে দেখি এক কুচকুচে পাথর, মাথাটা গোল। রকম দেখে মনে হয় ওমা! এটা তো শিব!' তিনি এরপর স্থানীয় পুজারিদের ডাকেন, এবং শুরু হয় পুজো।
পরে পাথরটি ভালো করে দেখে অনেকে বলেন, এটি পঞ্চমুখী শিবলিঙ্গের অংশ। যার পেছনের অংশ এখনও মাটির নিচে! লোকবিশ্বাস মতে, পঞ্চমুখী শিবলিঙ্গ বিরল এবং অত্যন্ত শক্তিশালী তান্ত্রিক রূপ। তৎক্ষণাৎ স্থানীয়দের মধ্যে উৎসাহ ছড়িয়ে পড়ে। গড়ে ওঠে অস্থায়ী মণ্ডপ। প্রতিদিন ভোরবেলা ও সন্ধ্যাবেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে চলতে থাকে ধ্যান-পাঠ-অর্চনা।
একজন স্থানীয় প্রত্নবীদ, বাপ্পাদিত্য মণ্ডল জানান, 'এই অঞ্চল একসময় রাঢ় বাংলার তান্ত্রিক কেন্দ্র ছিল। বহু গুপ্ত মন্দির আর পুরাতন দেবস্থান এখানে রয়েছে। সম্ভবত এটি সেই সময়কার কোনও ধ্বংসপ্রাপ্ত শিবমন্দিরের অংশ।' তবে কোনও সরকারি পুরাতত্ত্ব দফতর এখনও তদন্তে আসেনি।
স্থানীয় এক মহিলার দাবি, 'রাতে ওখানে থাকা যায় না। মনে হয় কেউ যেন আমাদের ওপর নজর রাখছে। আর ক্ষণে ক্ষণে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যায়, শুনতে পাওয়া যায়, সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দ।' কেউ কেউ আবার বলেছে পাথরটাকে না জেনে সরাতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই আর কেউই ওটাকে সরাতে যায় না। তাই এখনও অর্ধেক শিবলিঙ্গ মাটির নীচে।
পুরনো লোকগাথা অনুযায়ী, এই গ্রামে একসময় এক সন্ন্যাসী শিবসাধক বাস করতেন, যিনি মাটি খুঁড়ে লুকিয়ে রাখতেন শক্তির কেন্দ্রবিন্দুকে। এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নানান প্রশ্ন। এই শিবলিঙ্গ কি তাঁরই? নাকি প্রাক্-মধ্যযুগীয় কোন রাজবংশের? প্রশ্ন অনেক... উত্তর এখনও অজানা।
যদিও এর সরকারি স্বীকৃতি নেই, তবুও গ্রামের মানুষ শিবঠাকুরকে মানেন। তাঁদের বিশ্বাস, 'মাটি ফুঁড়ে যিনি উঠলেন, তিনি আবার ফিরে এলেন।'