Calcutta Television Network

ত্র্যম্বকেশ্বর, যেখানে জন্ম নিয়েছে গঙ্গা! সেখানে শিব বিরাজ করছেন ত্রিনেত্ররূপে...

মহারাষ্ট্রের নাসিক শহর থেকে মাত্র ২৮ কিমি দূরে অবস্থিত ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দির, বারো জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এবং শিবভক্তদের কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থ। শুধু শিবভক্তদের জন্য নয়, হিন্দুদের কাছে এটি পবিত্র কারণ এখান থেকেই উৎপন্ন হয়েছে গৌতামী গঙ্গা নদী। একদিকে পুরাণের অলৌকিক কাহিনী, অন্যদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলে ত্র্যম্বকেশ্বর হয়ে উঠেছে আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য কেন্দ্র। 

ত্র্যম্বকেশ্বরের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে শিবপুরাণে। কথিত আছে, গৌতম ঋষি এখানে কঠোর তপস্যা করছিলেন। দেবতারা তার ক্ষমতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে নানা ছলচাতুরী করলেন। একদিন গৌতম ঋষির আশ্রমে মহামারী ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ঋষি গঙ্গার আহ্বান করে বললেন, 'হে দেবী, এখানে আবির্ভূত হয়ে মানবজাতির কল্যাণ করুন।' 

ঋষির প্রার্থনায় গঙ্গা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। কিন্তু শর্ত ছিল—শিবের অনুমতি ছাড়া তিনি আসবেন না। তখন শিব এখানে ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হন এবং গঙ্গাকে অনুমতি দেন। সেই থেকেই এখানে গঙ্গার উৎস—গৌতামী গঙ্গা। 

‘ত্র্যম্বক’ শব্দের অর্থ তিন চোখবিশিষ্ট, অর্থাৎ শিবের তৃতীয় নয়ন। তাই এই জ্যোতির্লিঙ্গ শিবের ত্রিনেত্র রূপকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে। 

ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরের কাছেই রয়েছে ব্রহ্মগিরি পাহাড়, যেখান থেকে গঙ্গার উৎস। এই স্থানকে বলা হয় গঙ্গাদ্বার গুহা বা গাঙ্গেত্রী হিমাবাহ। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এখানে স্নান করলে জন্মের সব পাপ দূর হয়। 

বর্তমান ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দির ১৮শ শতকে পেশোয়া বালাজি বাজিরাও নির্মাণ করেন। পুরো মন্দির কালো পাথরে তৈরি। স্থাপত্যে আছে হেমাদপন্থি শৈলী। 

গর্ভগৃহে থাকা শিবলিঙ্গের বিশেষত্ব হল—এটি একেবারে গর্তের ভেতরে, এবং এর ওপর রূপার আবরণে সূর্য, চন্দ্র ও ব্রহ্মার প্রতীক খোদাই করা। এই তিন প্রতীকই ত্র্যম্বকেশ্বরের এক অনন্য মাহাত্ম্যকে তুলে ধরে। 

ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরে মহাশিবরাত্রি সবচেয়ে বড় উৎসব। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে বিশেষ পূজা, অভিষেক ও আরতি। শ্রাবণ মাসে হাজার হাজার ভক্ত কাবাড়ি নিয়ে গঙ্গাজল দিয়ে শিবলিঙ্গ স্নান করান। এছাড়াও প্রতি ১২ বছরে এখানে হয় কুম্ভ মেলা, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশের একটি। 

ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরের মাহাত্ম্য শুধু শিবলিঙ্গে নয়, গঙ্গার উৎসের কারণেও। বিশ্বাস করা হয়, এখানে পিণ্ডদান করলে পিতৃশান্তি হয়। সাপের ভয় বা নাগদোষ থেকেও মুক্তি মেলে। জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়। 

এবার আসি কীভাবে পৌঁছাবেন ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরে! এর নিকটতম শহর নাসিক (২৮ কিমি), নিকটতম রেলস্টেশন নাসিক রোড, নিকটতম বিমানবন্দর ওঝার (নাসিক) অথবা মুম্বাই (১৭০ কিমি দূরে)। নাসিক থেকে সহজেই ট্যাক্সি বা বাসে ত্র্যম্বকেশ্বর যাওয়া যায়। 

নাসিক শুধু ধর্মীয় নয়, এটি ওয়াইনের জন্যও বিখ্যাত। তবে ত্র্যম্বকেশ্বর এলাকায় নিরামিষ খাবারই প্রচলিত। এখানে গেলে গুজরাটি ও মহারাষ্ট্রীয় থালির স্বাদ নিতেও ভুলবেন না। 

এখানে বিশেষ দর্শনীয় স্থান শুধু মন্দির নয়, আরও অনেক কিছু। ত্র্যম্বকেশ্বর দর্শনের পর ঘুরে দেখুন ব্রহ্মগিরি পাহাড়, গঙ্গাদ্বার গুহা, গৌতম আশ্রম, অঞ্জনিরি পাহাড় (হনুমানের জন্মস্থান বলে বিশ্বাস)। 

ত্র্যম্বকেশ্বরের চারপাশে পাহাড়ের সবুজ, ঝরনা ও নদীর ধারা। এগুলো মিলে যেন প্রকৃতি নিজেই শিবের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ত্র্যম্বকেশ্বর শুধু একটি মন্দির নয়, এটি এক অনন্ত আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। যেখানে শিব বিরাজ করছেন ত্রিনেত্ররূপে, আর তাঁর আশীর্বাদে জন্ম নিয়েছে গঙ্গা—সেই স্থান ভক্তদের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থ। জীবনে একবার হলেও এই তীর্থে যাওয়া মানে অমোঘ পুণ্যলাভ।

শেয়ার করুন