গ্রামটির নাম ঘাঘরা। পুরুলিয়ার আড়শা ব্লকের এই ছোট্ট গ্রাম এতদিন অবহেলায় ছিল। কিন্তু হঠাৎই, শালবনের প্রান্তে এক প্রাচীন পাথরের দুর্গামূর্তি আবিষ্কৃত হতেই বদলে গেল সব। গভীর রাতে স্থানীয় যুবক বিভাস হেমব্রম এক অদ্ভুত আলো লক্ষ্য করে। সকালে সেই স্থানে খুঁড়ে পাওয়া যায় এক পাথরের দেবীমূর্তি — আট হাতে অস্ত্র, মুখে অমায়িক হাসি, কিন্তু চোখদুটি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
মূর্তিটি আবিষ্কারের পর থেকেই শুরু হয়েছে গ্রামবাসীর পূজা, পুষ্পাঞ্জলি, এবং অস্থায়ী মণ্ডপ গড়ে তোলা। প্রথমে ভেবেছিলেন স্থানীয় কোন পুরাতন ভাস্কর্য, কিন্তু দেবীর ডান চোখের কোণে জল, রাতের বেলায় ধূপ না জ্বালালেও ধূপের গন্ধে মাত হয়ে যেত এলাকা। এক মহিলা জানান, 'স্বপ্নে দেবী বলেছিলেন, এখানে তিনি শতাব্দী ধরে শুয়ে আছেন। ' এই ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় লোকেরা মনে করছেন, এটি একটি জাগ্রত সতীপীঠ হতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পঞ্চায়েত প্রশাসন খবর পাঠায় বিষ্ণুপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে। বিশেষজ্ঞ ড. অর্ণব চট্টোপাধ্যায় জানালেন, 'মূর্তির ধরণ কৌতুকেশ্বরী শৈলীর, যা সাধারণত ৮ম-৯ম শতকে রাজপুত সংযোগে গড়ে উঠত। এরকম চোখের অভিব্যক্তি প্রাক-পাল যুগের বৈশিষ্ট্য।' তবে কেউই এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না মূর্তিটি সতীপীঠ কি না। তবে দেবীর আকৃতির মধ্যে অলৌকিক বিমূর্ত সৌন্দর্য।
এই মূর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ২ টি দল।
১) লোকবিশ্বাসে আস্থাশীল গ্রামবাসী: তাঁরা বলছেন, দেবী স্বপ্নে এসেছেন, এই জায়গা এক শক্তিক্ষেত্র।
২) বিজ্ঞান ও অনুসন্ধান-নির্ভর প্রত্নতত্ত্ববিদেরা: তাঁরা বলছেন, আগে সময়, পরীক্ষা ও গবেষণা দরকার।
প্রতি মঙ্গলবার রাতে একটি সাদা পাখি মূর্তির মাথায় বসে — কেউ একে গরুড় বলে, কেউবা বলে এই পাখি শক্তির বাহন। স্থানীয় এক বৃদ্ধা বলছেন, তাঁর দাদামা’র কাছ থেকেও তিনি শুনেছেন, 'বনে এক মা থাকেন, যাঁর চোখ দুটো আগুনের মতো।'
ইতিমধ্যেই তিনদিন ধরে চলছে গ্রামীণ হাট ও ছোট পুজো। পুরোহিত, ঢাকিরা, যাত্রাপালা সব একসঙ্গে। গ্রামের নতুন নামকরণও হয়েছে — 'জাগ্রত ঘাঘরা'।
এই ঘটনা হয়তো বিজ্ঞান দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না। কিন্তু এক মূর্তি গ্রামকে জাগিয়ে তুলেছে। দুর্গার চোখ খুলেছে — এ যদি সত্য না-ও হয়, তবুও তা আত্মার জাগরণ নিশ্চিত করেছে। শালবনের মাটি, জনবিশ্বাস, আর দেবীমূর্তির চোখে থাকা সেই অদ্ভুত দীপ্তি — সবই মিলেমিশে তৈরি করেছে এক আধুনিক অলৌকিক লোককথা।