'জলের নিচে এক নারী থাকে… পূর্ণিমা রাতে উঠে আসে সে!' এই গুজব আজ নতুন নয়। উত্তর ২৪ পরগনার ছোট্ট এক গ্রাম — চন্দ্রাতলা। গ্রামের পাশেই বিশাল এক দিঘি, নাম চন্দ্রাতপী দিঘি। স্থানীয় বিশ্বাস, এই দিঘির জলে পূর্ণিমার রাতে ভেসে উঠে এক সাদা শাড়ি পরা নারী। কারো মতে সে জলের দেবী, কারো মতে সে অভিশপ্ত কন্যা, আর কেউ কেউ বলে — সে এক সতী আত্মা, যাঁকে কেউ স্পর্শ করলেই হারিয়ে যায় জলে!
গ্রামের বয়স্কদের মুখে এই কাহিনী প্রজন্ম ধরে ঘুরে ফিরে আসে। ৮৫ বছরের বৃদ্ধা রাধারাণী দাস বলেন, 'আমার ঠাম্মা বলত, বউঠান নামে এক ব্রাহ্মণ কন্যা ছিল। সে শিবরাত্রির উপোস করে দিঘিতে স্নান করতে গিয়ে জলে ডুবে যায়। তখন থেকেই সে জলে বাস করে।'
স্থানীয় কলেজের ভূগোলের অধ্যাপক ড. শুভদীপ সেন জানালেন, 'এই দিঘিটি ভূগর্ভস্থ গরম জলের উপর রয়েছে। রাতে তাপমাত্রা কমলে কিছু বাষ্পীয় গ্যাস উঠে আসে। তা পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নায় আলোর প্রতিফলনে ধোঁয়াচ্ছন্ন সাদা অবয়ব তৈরি করতে পারে।' এবং এখানেই প্রশ্ন — তাহলে এই সাদা অবয়ব কি বিজ্ঞানসম্মত প্রতিফলন, না কি লোকবিশ্বাসের তীব্র প্রত্যাশার রূপ?
কিছু স্থানীয় পুরোহিত ও বাউলরা বলেন, এটি 'চন্দ্রকণ্যা' নামে এক লৌকিক দেবীর আবির্ভাব। আবার অন্যদের মতে, এটি এক 'অপূর্য আত্মা' — যার কোনো শেষকৃত্য হয়নি। এই দ্বন্দ্ব আরও গভীর হয় তখন, যখন এক গ্রামীণ বাউল দুলাল দাস বলেন, 'আমার বাউলগানে আমি বলি — জলেতে জাগে যে বউঠান, সে শক্তির ছায়া। কালী নয়, কৃষ্ণীরূপী।'
কেউ কেউ দাবি করেছেন, একবার সন্ধ্যায় দিঘিতে নামা এক ছেলেকে কে যেন হাত ধরে টেনেছিল। এক গৃহবধূ বলছেন, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন — 'আমি সেই মেয়েটির ঘরে বসে আছি, সে আমাকে বলে - আবার এসো!' এসব গল্প শোনার পর মনে হয় বিজ্ঞান আর বিশ্বাস যেন একে অপরকে ঠেলছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত কেউই নিতে পারছে না।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগের এক গবেষক, ড. শর্মিষ্ঠা রায় জানিয়েছেন, 'এটি খুব সম্ভবত একটি লৌকিক দেবীর ভুলে যাওয়া উপাসনা। কালক্রমে, সেই দেবী ‘সতী’ বা ‘আত্মা’ হয়ে গিয়েছে লোককথায়। এ এক প্রক্রিয়া — দেবী থেকে ভূত হয়ে ওঠার।'
এই দিঘির জল এখনও পবিত্র বলে মানে অনেকে। প্রতি পূর্ণিমায় গ্রামের কিছু নারীরা এখানে প্রদীপ জ্বালিয়ে পুজো দেন। তাই এই জায়গাটি হয়ে উঠেছে অদৃশ্য এক শক্তির প্রাণকেন্দ্র। কারও কাছে তিনি দেবী, কারও কাছে রহস্য।