কোনো নারীকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, যে তাঁর পছন্দের পোশাক কী? বেশির ভাগ নারীই এককথায় উত্তর দেবেন, শাড়ি! যে কোনো অনুষ্ঠান হোক বা অফিস কিংবা কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া। বেশির ভাগ মেয়েরই প্রথম পছন্দ শাড়ি। শুধু আজ বলে নয়, যুগ যুগ ধরে, নারী ও শাড়ির মেল বন্ধন একই ভাবে বজায় আছে। আর সেজন্যই বলা হয়ে থাকে, ‘শাড়িই একমাত্র ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যা শতাব্দী ধরে ফ্যাশনে রয়েছে’। বিভিন্ন শাড়ির মধ্যে সিল্কের শাড়ির প্রতি নারীরা একটু বেশিই দুর্বল। সাধারণ নারীর পাশাপাশি সেলেব্রেটিদের কাছেও প্রথম চয়েস এই সিল্কের শাড়ি। চলুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে হল এই শাড়ির উৎপত্তি…
ইতিহাস বলছে, জনপ্রিয় সিল্ক শাড়ির উৎপত্তি হয় চীনে, তাও আবার নব্যপ্রস্তর যুগে। শোনা যায়, চীনের ইয়াংশাও সংস্কৃতিতে প্রথম সিল্কের উল্লেখ পাওয়া যায়। মনে করা হয়, আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৪ হাজার অব্দে, সিল্কের কাপড় দিয়ে শিশুদের জড়িয়ে রাখা হত। পরে, শ্যাং রাজবংশের কবর খুঁড়ে সিল্কের আরও নিদর্শন পাওয়া যায়। চীনের বিখ্যাত দার্শনিক কনফুসিয়াসের রচনা থেকে জানা যায়, চীনের রাজা হুয়াং তাই- এর স্ত্রী সাই লিং শি প্রথম আশ্চর্য ভাবেই নিজের অজান্তেই ‘সিল্কের’ আবিষ্কার করেন। কিন্তু, কিভাবে করলেন সিল্কের আবিষ্কার? চলুন জানা যাক।
একদিন চীনের রাণী সিং শি বাগানে তুঁত গাছের নীচে বসে চা পান করার সময়ে, গাছ থেকে রেশম পোকার কোকুন এসে পরে গরম চায়ের মধ্যে। তিনি চায়ের মধ্য থেকে কোকুনটি তুলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি লক্ষ্য করে দেখেন, কোকুনটি ধীরে ধীরে পাক খুলতে শুরু করছে, এবং তিনি আরও লক্ষ্য করলেন, কোকুন থেকে সুতোর মতো দেখতে কিছু একটা বেরিয়ে আসছে। তিনি অবশ্য বুঝতে পারেননি, কোকুন থেকে কিভাবে সুতো বেরিয়ে এল? তিনি এর উত্তর জানার জন্য, তুঁত গাছের কাছে গিয়ে দেখলেন, গাছের মধ্যে বাসা বেঁধেছে একাধিক রেশম পোকা। রেশম পোকার কোকুন থেকে রাণীই প্রথম খোঁজ পেলেন সিল্ক সুতোর, এবং তিনিই প্রথম শুরু করলেন রেশম চাষ করার প্রথা। রাণী এভাবেই সিল্ক সুতোর আবিষ্কার করছিলেন। আর সিল্কের আবিষ্কার করার জন্য, তাঁকে চীনের পুরাণে সিল্কের দেবী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
চীনে প্রায় তৃতীয় সহস্রাব্দ পর্যন্ত এই তথ্য গোপন করে রাখা হয়েছিল। এমনকি, চীনে একটা সময় সিল্কের ব্যবসা, জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, সেই ব্যবসার কথাও বাইরের দেশের কাছে প্রকাশ করেনি চীন। চীনের কিছু মানুষ একচেটিয়াভাবে সিল্ক উৎপাদন করত। সিল্ক উৎপত্তির পর, প্রথম দিকে সিল্কের কাপড় শুধুমাত্র রাজা বা রাজ পরিবারের সদস্যরা পরতেন। সেই সময়ে সিল্কের কাপড়কে আভিজাত্যের প্রতীক বলা হত। রাজপরিবারে সিল্কের কাপড় পরা হত রঙের উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ রাজা বা সম্রাটরা পরতেন সাদা রঙের সিল্কের পোশাক। রাণী বা পরিবারের অন্য সদস্যরা পরতেন হলুদ রঙের সিল্ক। তবে, সিল্ক কেবল কাপড় হিসেবেই ব্যবহার হত এমন নয়, সিল্কের উপর লেখার প্রচলনও ছিল। সেই সময়ে, সিল্ক থেকে তৈরি কাগজ ছিল, সব থেকে দামী কাগজ, যা কেবল রাজকার্যেই ব্যবহার করা হত। আস্তে আস্তে আভিজাত্যের গন্ডি পেরিয়ে মানুষের নাগালে চলেই আসে সিল্কের পোশাক। তবে, চীনের ভৌগোলিক ও সামাজিক সমৃদ্ধিতে, অনেকটাই অবদান ছিল সিল্ক শিল্পের। সিল্কের উজ্জ্বলভাব ও বিশেষ গঠনবিন্যাসের কারণে, খুব শীঘ্রই সিল্ক জনপ্রিয় প্রসাধন সামগ্রী হয়ে উঠেছিল। চীনে বণিকরা যে পথ দিয়ে, সিল্কের ব্যবসা করতে যেতেন, সেই রাস্তার নাম বর্তমানে সিল্ক রোড। এখনও চীনের সিল্ক রোডে সিল্কের বিভিন্ন পোশাক পাওয়া যায়।
পোশাকের পাশাপাশি সিল্কের শাড়িও সমান ভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতের বিভিন্ন জায়গায়, বেশ কিছু জনপ্রিয় সিল্কের শাড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। সেগুলি হল বেনারসি সিল্ক, অসমের মুগা সিল্ক, মহারাষ্ট্রের নওভারি শাড়ি,কাতান সিল্ক, বালুচরী সিল্ক, বোমকাই সিল্ক, কাশ্মীরি সিল্ক, গাদোয়াল সিল্ক, মহেশ্বরী সিল্ক, মহীশূর সিল্ক ইত্যাদি। শাড়ি আবিষ্কারের পর থেকে কেটে গিয়েছে অনেকটা সময়, সমাজও আজ অনেক এগিয়েছে। পোশাকেও অনেক আধুনিকতার ছোঁয়া এসেছে। শাড়ির পাশাপাশি পশ্চিমী পোশাকের রমরমা বেড়েছে প্রবল। কিন্তু যতই আধুনিক পোশাক আসুক না কেন, শাড়িই কিন্তু নারীর প্রথম পছন্দ। বিভিন্ন শাড়ির পাশাপাশি সিল্ক শাড়ির চাহিদাও বেড়েছে। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত একটুও চাহিদা কমেনি, বরং যতদিন দিন এগিয়েছে, সিল্কের জনপ্রিয়তা ততই বেড়েছে। সিল্কের শাড়ির দামও সকলের সাধ্যের মধ্যে, চাইলেই সবাই কিনে ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি সিল্ক শাড়ি পরেও আরামদায়ক। সাধ্যের মধ্যে সিল্কের শাড়িতে সাজিয়ে তোলার জন্য, এখন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে শাড়ির অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যেমন CTVN AKD PLUS চ্যানেলে নামী দামি বুটিক এবং শাড়ির দোকানের সন্ধান দিয়ে থাকেন। জানতে অবশ্যই নজর রাখুন সেই সমস্ত অনুষ্ঠানগুলিতে।