জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জটিল কাঠামোগুলির মধ্যে অন্যতম হল নিউক্লিয়াস (nucleus)। এটিকে অনেকেই কোষের 'মস্তিষ্ক' বলে আখ্যা দেন। কেননা কোষের বৃদ্ধি, বিভাজন, প্রোটিন তৈরি, বংশগত তথ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন-সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই নিউক্লিয়াস।
নিউক্লিয়াস কী?
নিউক্লিয়াস হল একটি ঝিল্লিবেষ্টিত অঙ্গাণু, যা অধিকাংশ ইউক্যারিওটিক কোষে থাকে। এটি একটি দ্বিস্তরীয় নিউক্লিয়ার মেমব্রেন দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা কোষের বাকি অংশ থেকে নিউক্লিয়াসকে পৃথক করে। এই পর্দায় অসংখ্য ছিদ্র (nuclear pores) থাকে, যার মাধ্যমে তথ্য ও অণুর আদান-প্রদান হয়।
নিউক্লিয়াসের প্রধান অংশ-
নিউক্লিয়ার মেমব্রেন - দ্বিস্তরীয় আবরণ, যেখানে ছিদ্র থাকে।
নিউক্লিওপ্লাজম - জেলি সদৃশ তরল, যেখানে নিউক্লিয়াসের বিভিন্ন উপাদান ভেসে থাকে।
নিউক্লিওলাস - নিউক্লিয়াসের ভেতরে গঠিত একটি ক্ষুদ্র দানা, যেখানে রাইবোসোম তৈরির প্রক্রিয়া হয়।
ক্রোমাটিন ও ক্রোমোজোম – DNA ও প্রোটিনের জটিল গঠন, যেখানে জিনগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
DNA, RNA ও প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া-
নিউক্লিয়াসকে কোষের তথ্যকেন্দ্র বলা হয় কারণ এখানে সংরক্ষিত থাকে DNA-যা জীবনের নকশা (genetic code)।
DNA থেকে প্রথমে তৈরি হয় mRNA (messenger RNA) - একে বলে ট্রান্সক্রিপশন।
mRNA নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে যায় এবং সাইটোপ্লাজমে প্রোটিন তৈরির জন্য নির্দেশ দেয়-এটি হল ট্রান্সলেশন।
এভাবেই কোষ তার প্রয়োজনীয় এনজাইম ও প্রোটিন তৈরি করে।
ক্রোমোজোম ও জিন-
মানব কোষে থাকে ৪৬টি ক্রোমোজোম।
প্রতিটি ক্রোমোজোমে হাজার হাজার জিন থাকে।
এই জিনই নির্ধারণ করে চোখের রঙ, রক্তের গ্রুপ, উচ্চতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য।
ক্রোমোজোম মূলত DNA কে অত্যন্ত সংকুচিত আকারে প্যাকেজ করে রাখে, যাতে অল্প জায়গায় বিশাল তথ্য সংরক্ষণ সম্ভব হয়।
কোষ বিভাজন ও নিউক্লিয়াস-
নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির একটি হল কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণ। এ সময় DNA দ্বিগুণ হয়, এবং মাইটোসিস বা মিয়োসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমানভাবে কন্যা কোষে বিতরণ হয়।
প্রোফেজ - ক্রোমোজোম ঘনীভূত হয়, নিউক্লিয়ার পর্দা ভেঙে যায়।
মেটাফেজ - ক্রোমোজোম কোষের মধ্যরেখায় সারিবদ্ধ হয়।
অ্যানাফেজ - প্রতিটি ক্রোমাটিড আলাদা হয়ে যায়।
টেলোফেজ - নতুন নিউক্লিয়াস তৈরি হয়।
DNA মেরামত ও স্থায়িত্ব-
DNA প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে নিউক্লিয়াসে থাকা বিশেষ প্রক্রিয়াগুলি সেটিকে মেরামত করে। যেমন-
Mismatch Repair - ভুল জোড়া সংশোধন করে।
Base Excision Repair - ক্ষতিগ্রস্ত বেস কেটে ফেলে।
Nucleotide Excision Repair – বড় ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে নতুন করে তৈরি করে।
এতে জেনেটিক তথ্য সঠিক থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হয়।
নিউক্লিয়াসবিহীন কোষ-
সব কোষে নিউক্লিয়াস থাকে না। যেমন-
মানুষের লোহিত রক্তকণিকা (RBC) - এগুলি পরিপক্ব অবস্থায় নিউক্লিয়াস হারায়, যাতে বেশি জায়গা পায় অক্সিজেন বহন করার জন্য।
ব্যাকটেরিয়া ও সায়ানোব্যাকটেরিয়া - এদের নিউক্লিয়াস নেই; DNA ভাসমান অবস্থায় সাইটোপ্লাজমে থাকে।
জীববিজ্ঞানে নিউক্লিয়াসের গুরুত্ব-
এটি কোষের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
DNA সংরক্ষণ করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বৈশিষ্ট্য বহন করে।
প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়।
কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণ করে।
জীবের বিবর্তন, বৃদ্ধি ও টিকে থাকা-সব কিছুর মূলেই রয়েছে নিউক্লিয়াস।