অসীম সেনঃ ভোট শেষ। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। পঞ্চানন্দ তালুকদার গুণ গুণ করে গেয়ে যাচ্ছেন মাছ চোর মাছ চোর। টুলটুল বৌদির স্কুলে গরমের ছুটি। ঘ্যান ঘ্যান করেই চলেছেন কয়েকদিন। আসলে পোস্টপোল ভায়োলেন্সয়ের কথা মাথায় রেখে এবারে কোথাও ঘুরতে যাবার প্ল্যান করা হয়নি। কিন্তু এবারে এমন রক্তহীন ভোট ভয়ের অবকাশ রাখল না। সুতরাং কোথাও যেতে হয়। ডাক পড়ল দীপুর। ডালের পুর দেওয়া হিং এর কচুরি খেতে খেতে দীপু আলতো করে উচ্চারণ করল 'পাড়েন' । উত্তরবঙ্গে বেশ কিছু অফবিটের নাম শোনা গেছে বটে। কিন্তু এমনধারা নাম আগে শোনেননি তালুকদার দম্পতি। দুজনেই কচুরিতে কনসেনট্রেট না করে নড়েচড়ে বসলেন। পাড়েন কালিম্পং জেলা গোরুবাথানের কাছে অবস্থিত একটি শান্ত পাহাড়ি গ্রাম। জলঢাকা নদী পাহাড় চা বাগান এবং ঘন জঙ্গল । পাখি ডানা ঝাপটালে চমকে যেতে হয়। এতটাই নিস্তব্ধ পরিবেশ এখানে।
পাইন বনের আবডালে বয়ে যায় জলঢাকা। সন্ধ্যা পেরোতেই আকাশে তারার মেলা আর কফির মগ হাতে আপনি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনছেন। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার জলঢাকা ব্লকের অন্তর্গত পাড়েন গ্রামটি ভারত-ভুটান সীমান্তের খুব কাছে অবস্থিত। যারা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য পাড়েন আদর্শ। এখান থেকে জঙ্গলের পথ ধরে ছোট ছোট ট্রেকিং রুটে ঘুরে আসা যায়। গ্রামের বুক চিরে চলে যাওয়া পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখা মিলবে নাম না জানা অসংখ্য বুনো ফুলের। পাড়েন পাখিদের আলাদা রাজ্য। এখানে দেখতে পাবেন হিল ময়না বুলবুল থেকে শুরু করে বিরল প্রজাতির হিমালয়ের পাখি পাড়েনের খুব কাছেই ঝালং ও বিন্দু। যদিও আপানাদের দুজনের হাঁটুই বিগড়েছে। একটু থামল দীপু। এই কথাটা মোটেও পছন্দ নয় টুলটুল বৌদি। হাঁটুতে বাত শুনলে কেমন যেন বুড়ো বুড়ো লাগে। দীপু সে সব থোরাই কেয়ার করে। বলতে থাকল, যদি হাঁটতে পারেন তাহলে জঙ্গলের পথ ধরে ছোট ছোট ট্রেকিং রুটে ঘুরে আসা যায়। হাঁটতে হাঁটতে দেখা মিলবে অসংখ্য ফুলের। তাদের অধিকাংশই আপনাদের অজানা। এখান থেকে যেতে পারেন তোদে-তাংতাতেও। আরও উঁচুতে এই দুই গ্রাম পরিচিত এলাচ চাষের জন্য। এ গ্রাম যেন পাহাড়ের যমজ বোন। তোদে তাংতা হয়ে পৌঁছতে পারেন চিসাং। এই নাম না জানা পাহাড়ি গ্রামে নিঝুমপুরের রূপকথা শোনায় চুপকথারা। চিসাং এর ভোর হয় কাঁচের জানলায় কুয়াশার ঝাপটায়। চিসাং ছুঁয়ে রয়েছে ভারত-ভুটান ও সিকিম সীমান্ত। ব্যালকনি থেকে চোখের সামনে ডোকালাম পাহাড়। চিসাং এর জঙ্গলে রয়েছে হাজারও ওষধি গাছ। বেখেয়ালে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসুন খরস্রোতা ডাভে খোলার পাড়ে। এখানে স্কারলেট মিনিভেট, বারবেট, রুফারস নেকড হর্নবিল, পারপেল সানবার্ডদের কলতান লেগে থাকে সারাক্ষণ।
চিসাং এ সন্ধ্যা নামে কালো গাভীর মত। কালচে নীল পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ভেসে বেড়ায় নেপালি বাঁশির সুর। দেশলাই বাক্সের মত দূর পাহাড়ের বাড়ি গুলিও ধীরে ধীরে মুছে যায়। জেগে ওঠে জোনাকির মত আলোর মালা। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে পাহাড়। চার রাত পাঁচ দিনের ট্যুর হতে পারে পাড়েন এবং চিসাং। নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে গাড়িতে চালসা হয়ে নাগরাকাটা পার করে পাহাড়ি পথ ধরে পাড়েন। গাড়ি ভাড়া মরসুম অনুসারে হেরফের হয়। তবে যদি শেয়ার গাড়ি করে যাতায়াত না করেন তাহলে প্রতি দিন একটি ছোট গাড়ির জন্য ধরে রাখা যায় গড়ে ৩৭০০ টাকা থেকে ৪০০০ টাকা। পাড়েন ও চিংসায় রাত্রিবাসের পরিকল্পনা থাকলে জন প্রতি গোটা দিন থাকা খাওয়ার জন্য ধরে রাখতে পারেন ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে যোগ করে নেবেন। কচুরি শেষ করে কফির কাপে হালকা চুমুক দিয়ে দীপু বলল যেতে হলে এর মধ্যেই যান। বর্ষাকালে এই রুট এড়িয়ে চলাই ভালো।