Calcutta Television Network

পাশার পেছনে পুরাণ! জুয়া খেলায় যুধিষ্ঠির, শিব-পার্বতী ও নিয়তির লীলা...

জুয়া বা পাশা খেলা—আজ আমরা একে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখি। কিন্তু ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্যে এই পাশা খেলা কেবল এক ধরনের বিনোদন নয়, বরং তা ছিল এক গভীর নৈতিক সংকট, ধর্মের পরীক্ষা, এবং নিয়তির নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি। মহাভারত থেকে শুরু করে শিব-পার্বতীর তান্ত্রিক লীলা পর্যন্ত, জুয়ার ব্যাখ্যা ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। 

পাশা খেলার সবচেয়ে করুণ ঘটনাটি ঘটেছিল মহাভারত-এর দ্যূতসভায়। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির—যিনি সৎ, ন্যায়বান, কিন্তু দুর্বলচিত্ত—তিনি কৌরবদের কৌশলে পাশা খেলায় বসে যান। তিনি একে একে বাজি রাখেন—রাজ্য, ভাই, এমনকি নিজেকেও, অবশেষে দ্রৌপদীকেও বাজিতে রাখেন।

এই ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত যেন ভারতীয় সভ্যতার এক কলঙ্কচিহ্ন। সভায় দ্রৌপদীকে টেনে আনা, অপমান করা—সবই ঘটেছিল পাশা খেলার মাধ্যমে। এই দ্যূতসভা বুঝিয়ে দেয়, যখন ধর্মও মোহগ্রস্ত হয়, তখন সভ্যতাও মুখ থুবড়ে পড়ে। 

লোকপুরাণ ও তান্ত্রিক বিশ্বাসে বলা হয়, কখনো কখনো শিব-পার্বতী পাশা খেলতেন। এক বিখ্যাত গল্পে পার্বতী পাশায় জয়ী হন, কিন্তু শিব পরাজয় মানতে নারাজ হন। ফলে শুরু হয় তর্ক, রাগ ও দাম্পত্য দ্বন্দ্ব—যা প্রতীকীভাবে সৃষ্টি ও বিনাশের চক্রকে বোঝায়। এই খেলায় লুকিয়ে থাকে মায়ার দর্শন—জীবন এক লীলা, যেখানে জয়-পরাজয় অনন্ত ঘূর্ণিপাকে ঘোরে।

শাস্ত্রে ব্রাহ্মণ ও ধর্মপালনকারীদের জন্য জুয়া নিষিদ্ধ। অর্থশাস্ত্র মতে, চাণক্য বলেন—যদি নিষিদ্ধ না করা যায়, তবে রাষ্ট্র যেন তার উপর কর আরোপ করে। এই দর্শন বুঝিয়ে দেয়—জুয়া কেবল একান্ত ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, তা সমাজের জন্য হানিকরও বটে। 

রামায়ণে জুয়া নেই, কিন্তু সে খানে আছে পাশার খেলা। যদিও রামায়ণে সরাসরি পাশা খেলার কথা নেই, তবে কেইকেইয়ের মন্ত্রণা, ষড়যন্ত্র এবং রামের বনবাস—এই সমস্ত কিছু এক ধরনের 'অদৃশ্য পাশা খেলা'র রূপ। এখানে ভাগ্যের খেলা চলে রাজনীতির ছদ্মবেশে। 

পৌরাণিক বিশেষজ্ঞরা অনেকেই দ্যূতসভাকে এক আত্মিক রূপক বলে মনে করেন। পাশা খেলাকে মন ও ইন্দ্রিয়ের সংঘাত বলে মনে করা হয়। আবার বাজিকে অহংকার, কামনা, সম্পর্ক বলা হয়। পরাজয়কে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানো বলে। জয়কে জ্ঞানলাভ ও মোহভঙ্গ বলা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পাশা হয়ে ওঠে আত্মজিজ্ঞাসার এক প্রতীকী পথ। 

বৌদ্ধ ধর্মে পাশা খেলা পাঁচটি বর্জনীয় ক্রীড়ার একটি। জৈন ধর্মেও এটি কাম-ক্রোধের প্রবৃত্তি উস্কে দেয় বলে এই খেলা বর্জিত। ভারতীয় পুরাণে জুয়া কেবল খেলাধুলা নয়। তা এক আত্মপরীক্ষা, এক নৈতিক সংকট, এক আদর্শচ্যুতি। যুধিষ্ঠিরের দ্যূতসভা হোক, শিব-পার্বতীর লীলাপাশা হোক, কিংবা বৌদ্ধ শাসনের বিধি—সব ক্ষেত্রেই জুয়া হয়ে উঠেছে জীবনের সেই খেলা, যেখানে নৈতিকতা, আসক্তি ও আত্মজয় একে অপরকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

শেয়ার করুন