আজ আমাদের জীবনে "রবিবার" মানেই বিশ্রাম, পরিবার, আনন্দ এবং অবসর। সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী—সবার জন্যই এই দিনটি এক পরমপ্রত্যাশিত দিন। কিন্তু কখনও কি আমরা ভেবেছি, কেন রবিবারই ছুটি? কেন শুক্রবার বা সোমবার নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিয়ে যায় ব্রিটিশ শাসনের সময়ে, যখন ভারতের মাটিতে "সপ্তাহের একদিন ছুটি" আদায় করতে লড়াই করতে হয়েছিল শ্রমিকদের। এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের অগ্রপথিক ছিলেন এক মহান ব্যক্তি—শ্রী নারায়ণ মেঘাজি লোখন্ডে।
রবিবার ছুটির পেছনের ইতিহাস:
১৯ শতকে ব্রিটিশরা যখন ভারতে শাসন করছিল, তখন দেশজুড়ে কলকারখানার বিস্তার ঘটেছিল। কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়—সপ্তাহে সাত দিন কাজ, কোনও ছুটি নেই, বিশ্রামের সুযোগ নেই। অন্যদিকে, ব্রিটিশ কর্মচারীরা প্রতি রবিবার গির্জায় প্রার্থনা করতেন, এবং ছুটি পেতেন।
এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে যান শ্রমিক নেতা নারায়ণ মেঘাজি লোখন্ডে। তিনি সরাসরি ব্রিটিশ অফিসারদের বলেন, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করিয়ে একদিন ছুটি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা। সেই সঙ্গে তিনি কৌশলে যুক্তি দেন—রবিবার হিন্দু দেবতা খন্ডোবার (খন্ডেরায়) জন্মদিন, তাই হিন্দুদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনটিকে ছুটির দিন হিসাবে গণ্য করা হোক।
এই প্রস্তাব ব্রিটিশ সরকার প্রথমে অগ্রাহ্য করে। কিন্তু লোখন্ডে থেমে যাননি। সাত বছর ধরে আন্দোলন, দাবিপত্র এবং জনমত গঠনের মাধ্যমে তিনি চাপ সৃষ্টি করেন।
লড়াইয়ের জয় ও ছুটির সূচনা:
অবশেষে, তাঁর দাবিকে মেনে নেয় ব্রিটিশ সরকার। ১৮৯০ সালের ১০ জুন, এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে ঘোষণা করা হয়—ভারতের শ্রমিকদের জন্য সপ্তাহে একদিন, রবিবার ছুটি থাকবে।
শুধু তাই নয়, লোখন্ডের দাবিতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম চালু হয়:
মাসের ১৫ তারিখে বেতন দেওয়ার নিয়ম
কাজের সময় খাওয়ার জন্য আধঘণ্টা বিরতি
এইসব নিয়ম আজও চালু আছে। ব্রিটিশরা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও, রবিবার ছুটির প্রথা চিরস্থায়ী হয়ে গেছে ভারতের কর্মসংস্কৃতিতে।
আজ যখন আমরা রবিবারে অবসর উপভোগ করি, তখন ভুলে গেলে চলবে না শ্রী নারায়ণ মেঘাজি লোখন্ডে-র অবদানকে। তিনি না থাকলে হয়তো আজও আমাদের সপ্তাহে সাত দিন কাজ করতে হতো, কোনও ছুটি ছাড়াই। তাঁর দূরদৃষ্টি ও সাহসের কারণেই আজ আমরা একটুখানি মুক্ত বাতাস নিতে পারি।