ঝাড়খণ্ডের দেবঘর, নামেই যেন রয়েছে ভক্তির সুর। এখানেই বিরাজমান বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ, যা হিন্দুধর্মে শিবের বারো জ্যোতির্লিঙ্গের একটি বলে মানা হয়। এই পবিত্র স্থানকে আবার অনেকে বলেন বাবা ধাম বা বৈদ্যনাথধাম। শ্রাবণ মাসে লাখো লাখো ভক্ত এখানে আসেন কাঁভারিয়া যাত্রা করতে। ভক্তদের বিশ্বাস—যে হৃদয়ে বৈদ্যনাথ বিরাজ করেন, সে হৃদয় অমৃতময় হয়।
এই তীর্থের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক আশ্চর্য কিংবদন্তি। কথিত আছে—লঙ্কাধিপতি রাবণ মহাদেবকে প্রসন্ন করতে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তিনি নিজের দশটি মস্তক একে একে কেটে শিবের উদ্দেশে অর্পণ করতে থাকেন। নবম মস্তক কাটার পর শিব প্রসন্ন হয়ে তাঁকে দর্শন দেন এবং বললেন, 'তুমি আমাকে যেখানে নিয়ে যাবে, আমি সেখানেই স্থিত হব।'
শর্ত ছিল—রাস্তায় একবারও মাটিতে শিবলিঙ্গ রাখতে পারবে না। রাবণ সম্মত হন। কিন্তু দেবতারা রাবণের শক্তি দেখে ভয় পেয়ে এক কৌশল করেন। পথে রাবণের তীব্র পিপাসা মেটাতে গোপন পরিকল্পনায় সে শিবলিঙ্গ মাটিতে রাখে। তখনই শিব বললেন, 'যেখানেই আমাকে স্থাপন করবে, আমি সেখানেই বিরাজ করব।' সেই স্থানই আজকের দেবঘর বৈদ্যনাথধাম।
একটি কাহিনী অনুসারে, শিব এখানে বৈদ্য (চিকিৎসক) রূপে বিরাজ করেন। পুরাণ মতে, শিব দেবতাদের অসুখ সারাতে বৈদ্যরূপে চিকিৎসা করেছিলেন। তাই এই জ্যোতির্লিঙ্গের নাম হয় বৈদ্যনাথ।
বৈদ্যনাথধাম মন্দির কমপ্লেক্সে ২২টি মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিবমন্দিরের শিখর আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে গঙ্গাজলভরা ঘড়া। এখানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—ভক্তরা শিবলিঙ্গ স্পর্শ করে পুজো করতে পারেন।
প্রতি বছর শ্রাবণ মাসে লাখ লাখ কাঁভারিয়া সুলতানগঞ্জ থেকে নর্মদার জল এনে পায়ে হেঁটে দেবঘরে পৌঁছায়। এখানের দূরত্ব প্রায় ১০৫ কিমি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই যাত্রা সম্পন্ন করলে সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয়।
এবার আসি কীভাবে যাবেন এই স্থানে? নিকটতম রেলস্টেশন জাসিডিহ (দেবঘর থেকে ৭ কিমি দূরে) আর নিকটতম বিমানবন্দর দেবঘর এয়ারপোর্ট। সড়কপথে ঝাড়খণ্ড ও বিহারের বিভিন্ন শহর থেকে সহজেই যাওয়া যায়। বৈদ্যনাথধাম শুধু একটি মন্দির নয়, এটি বিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের প্রতীক। এখানে এসে ভক্তরা মনে করেন—শিবের করুণায় সমস্ত ব্যাধি দূর হয়, জীবন শান্তি ও শক্তিতে ভরে ওঠে।