Calcutta Television Network

যেখানে মৌনতা কাঁপে ঈশ্বরচিন্তায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি – গরুড় দেব...

পুরী ধামে জগন্নাথ মন্দির কেবল এক তীর্থস্থান নয়, এটি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার এক মহাসিন্ধু। এই পবিত্র মন্দিরের প্রতিটি ইট, প্রতিটি অলিন্দ, প্রতিটি স্তম্ভ যেন মহাকালের মৌন ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলে। এই ইতিহাসেরই এক নীরব অথচ অলৌকিক প্রতীক হলেন – গরুড় স্তম্ভ বা গরুড় দেব। 

পুরাণ অনুসারে, গরুড় হলেন বিষ্ণু ভগবানের বাহন। তবে বাহনের পরিচয় তাঁর একমাত্র গৌরব নয়, বরং তিনি বিষ্ণুভক্তির এক নিরুপম প্রতিমূর্তি। যে কোনও সময়, যে কোনও পরিস্থিতিতে তিনি প্রভুর পাশে থেকেছেন—চুপচাপ, নিঃশব্দ সেবায় নিবিষ্ট হয়ে। পুরীর গরুড় স্তম্ভ সেই অটুট নিষ্কলুষ ভক্তির প্রতীক।

পুরীর মন্দিরে প্রবেশের ঠিক পূর্বে, গর্ভগৃহে অবস্থিত এই কালো পাথরের প্রাচীন স্তম্ভটি অনেকের কাছেই কেবল একটি মূর্তি নয়—এটি যেন এক আধ্যাত্মিক সংযোগকেন্দ্র। গরুড় দেবের মূর্তি এখানে হাঁটু গেড়ে বসা, অঞ্জলি মুদ্রায় প্রার্থনায় মগ্ন। তিনি মুখ করে আছেন মূল গর্ভগৃহের দিকে, যেন আজও তাঁর প্রভুকে চিরকালীন নিবেদনে বরণ করে নিচ্ছেন। এই গরুড় স্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, তবে বলা হয়—তিনি যেন স্বয়ং গর্ভগৃহে প্রবেশ করেই দর্শন করছেন। এটি কেবল বিশ্বাস নয়, বহু ভক্তের জন্য এটি হৃদয়ঙ্গম সত্য কথা। 

গরুড় স্তম্ভ নিয়ে নানা মত প্রচলিত। কেউ বলেন, এটি মগধ সাম্রাজ্য থেকে আনা প্রাচীন স্তম্ভ, যা ধর্মীয় কারণে এখানে স্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, অনেকে বলেন, এটি স্বয়ং মহাবল গরুড়ের পবিত্র প্রতিকৃতি—যিনি জগন্নাথের সঙ্গে চিরকাল যুক্ত থাকেন। স্থানীয় পুরোহিতরা বলেন, এই গরুড় স্তম্ভের কাছে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করলে, অন্তর থেকে যে কোনও সংকল্প করলে, তা জগন্নাথদেবের করুণায় পূর্ণতা পায়। 

পুরীর গরুড় স্তম্ভ কেবল একটি মূর্তি নয়, এটি হল ভক্তির আর এক নাম, ঈশ্বরের প্রতি অনন্ত সেবার মূর্ত প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো ভক্ত এই স্তম্ভের সামনে মাথা নত করে প্রণাম করেন, তারপরই তাঁরা মন্দিরে প্রবেশ করেন। যেন এই গরুড় স্তম্ভ হল ঈশ্বর দর্শনের পূর্বশর্ত—a spiritual checkpoint। 

এই স্তম্ভকে কেন্দ্র করে অনেকেই বলে থাকেন, এটি একধরনের ধর্মীয় তরঙ্গবাহী স্তম্ভ। পাথরের ভিতর গচ্ছিত রয়েছে কিছু অলৌকিক শক্তি।  বহু সাধক ও তাপস এখানে ধ্যান করে ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে গেছেন। এটি অনেকের মতে তপস্যারও উপযুক্ত ক্ষেত্র বা স্থান। 

এই গরুড় স্তম্ভ পুরী জগন্নাথ মন্দির, গর্ভগৃহের সম্মুখে অবস্থিত। গরুড় দেব হলেন ভগবান বিষ্ণুর বাহন। তিনি অঞ্জলি মুদ্রা করে, হাঁটু গেড়ে এই স্থানে বসে আছেন। এই স্তম্ভ কালো পাথরে খোদাই করা প্রাচীন শিল্পকলা। 

পুরীর গরুড় স্তম্ভ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভক্তি মানেই শুধু আরাধনা নয়, ভক্তি মানেই নিজেকে পুরোপুরি ঈশ্বরের উদ্দেশে সমর্পণ করা। সেই চিরন্তন ভক্তির এক নিশ্চুপ প্রহরী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছেন গরুড় দেব, প্রভুর চরণে নিঃশব্দে নিবেদিত হয়ে। আপনি যখনই যাবেন পুরী, মন্দিরে প্রবেশের আগে একবার থেমে যান এই গরুড় স্তম্ভের সামনে। চোখে চোখ রাখুন সেই অনন্ত ভক্তির মূর্তির প্রতি—হয়তো আপনার হৃদয়ের দ্বারও খুলে যাবে ঈশ্বর দর্শনের পর।

শেয়ার করুন