পুরাণে লক্ষ্মী হলেন বৈকুণ্ঠনিবাসী নারায়ণের সহধর্মিণী, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবী। তাঁর আবির্ভাব হয়েছে সমুদ্র মন্থনের সময়, তিনি প্রতিষ্ঠিত 'অষ্টলক্ষ্মী' রূপে—অন্ন, ধন, বুদ্ধি, বিজয়, সন্তান, সাহস, স্বাস্থ্য ও শান্তির দেবী।
কিন্তু বাংলার গৃহস্থের চোখে লক্ষ্মী ততটা পৌরাণিক নন, যতটা নিজের ঘরের মানুষ। তিনি গৃহবধূ, যাঁকে প্রতিদিন ভাতের হাঁড়ি, ঝাঁট, ধানের কুন্ড, গোয়ালঘর আর লেপার উঠোনে খুঁজে পাওয়া যায়। লোককথায় লক্ষ্মী শুধু ধনদাত্রী নন—তিনি হলেন সংসারদাত্রী।
বাংলার গ্রামীণ সমাজে লক্ষ্মীর সঙ্গে ধান ও গোলার সম্পর্ক একেবারে অস্তিত্বগত। ধান আসলে এক পবিত্র সত্তা, যার মধ্যে বাস করেন লক্ষ্মী। ধান শুকোনো, গোলায় তোলা, কুন্ডে রাখা—সবই একেকটা আচার। নতুন ধান উঠলে 'নবান্ন', আর তারপরেই 'লক্ষ্মী পুজো'। লোকবিশ্বাস বলে—‘যে বাড়ির গোলা ভরে, সেখানে লক্ষ্মী বাস করে।’
কৃষিজীবী বাংলায় এই ধানই ছিল জীবনের একমাত্র ভরসা। তাই ধানের মধ্যে লক্ষ্মীর রূপ কল্পনা করা এক অর্থে ছিল জীবনকেই পুজো করা।
লোকমুখে বলে, 'ঘর গুছিয়ে রাখলে লক্ষ্মী আসেন'। এই কথার মধ্যে এক গভীর দার্শনিকতা আছে। লক্ষ্মী এখানে শুধুই স্বর্ণ বা ধন নয়—তিনি পরিপাটি সংসারের প্রতীক। রান্নাঘর, গোয়াল, উঠোন, হাঁড়ির ভাত—এইসবের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পায় দেবীত্ব।
বাড়ির গৃহবধূ যেভাবে রোজ সকালে উঠে হাঁড়ি-কড়া মাজেন, গোয়ালঘর সাফ করেন, উঠোনে জল ছিটিয়ে আলপনা আঁকেন—এ সবই এক প্রকার ‘নিত্যপূজা’। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে দু’ফোঁটা ঘি ঢালা শুধু নয়, চুপচাপ বিশ্বাস করা—লক্ষ্মী আছেন ঘরের কোণায়।
বাংলার গৃহস্থ জীবনে গরু ও ধান ছিল প্রধান সম্বল। তাই ধানের সঙ্গে গরুও লক্ষ্মীর চিহ্ন। লোককথায় বলা হয়—লক্ষ্মী গাভী ও ধান দুই-ই সঙ্গে করে আনেন। বিশেষ করে দীপান্বিতা লক্ষ্মীপূজার রাতে গরুকে গোসল করিয়ে তেল মালিশ করা হয়, পা ও শিংয়ে আলতা লাগানো হয়, কারণ লক্ষ্মীর বাহন সে।
এমনকি কোথাও কোথাও বিশ্বাস করা হয়, গরুর মুখ দিয়ে লক্ষ্মী কথা বলেন। তাই গরু চলে গেলে, অর্থাৎ গৃহপালন বন্ধ হলে, বলা হয়—'লক্ষ্মী রাগ করে চলে গেছেন।'
'লক্ষ্মীর পায়ে কলঙ্ক'—এই প্রবাদ লক্ষ্মীকে এক কন্যারূপে কল্পনা করে। বাংলায় লক্ষ্মী এক ঘরছাড়া মেয়ে, যিনি রাগ করলে শ্বশুরবাড়ি (অর্থাৎ বাড়ির ভেতর) ছেড়ে চলে যান। তাই তাঁকে ঘরে ধরে রাখতেই মেয়েরা করেন লক্ষ্মী ব্রত, কোলাকুলি লক্ষ্মী, বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মী, এমনকি শীতকালে গৃহলক্ষ্মী পূজা।
এই ব্রতগুলোতে লক্ষ্মী কখনো গরিব কৃষকের কন্যা, কখনো স্বামীহারা স্ত্রী, কখনোবা জেঠানের খারাপ ব্যবহারে রাগ করে চলে যাওয়া বৌ। লোকগাথায় তিনি রক্তমাংসের মানুষ। এজন্যই লক্ষ্মীর গল্পে যত না অলৌকিক, তার চেয়ে বেশি গৃহসংসারের বেদনা ও মমতা।
লক্ষ্মীর চিহ্ন শুধু শঙ্খ-পদ্ম নয়, ঝাঁটা ও চালভাজাও। পুরাণে লক্ষ্মীর প্রতীক শঙ্খ, পদ্ম, অলঙ্কার। কিন্তু বাংলার ঘরে লক্ষ্মীর আসল চিহ্ন হল ঝাঁটা, যা পরিচ্ছন্নতা ও গৃহরক্ষার প্রতীক; ধানের আঁটি, যা সমৃদ্ধি বোঝায়। এছাড়াও চালভাজা, যা সততা ও স্বল্প আহারের সংস্কার বোঝায়; আলপনা, যা শুভ লক্ষ্মীপদ চিহ্ন; নকুলদানা ও মিষ্টি , যা অমায়িকতা ও মিষ্টভাষার প্রতীক।
পুরাণের লক্ষ্মী যদি হন দেবলোকে বসবাসকারী ধনদাত্রী, বাংলার লক্ষ্মী হলেন নতুন ধান, পরিপাটি হাঁড়ি, পরিষ্কার উঠোন আর গরুর চোখের শান্তি। তিনি শাস্ত্রের দেবী নয়—মানুষের ঘরের আত্মা। এইভাবেই ধানের কুন্ড থেকে উঠে এলেন লক্ষ্মী—গৃহবধূর ছায়া হয়ে সংসারে দেবীত্বের উত্থান।