Calcutta Television Network

মল্লিকার্জুনে মহেশ্বরের মিলন! শিব-শক্তির দ্বৈতপীঠ শ্রীশৈলম...

দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের নয়াল্লামালা পাহাড়ঘেরা জনপদ শ্রীশৈলম—সেই তীর্থ যেখানে প্রাচীনকাল থেকেই আধ্যাত্মিকতা ও পুরাণ মিলেমিশে এক পবিত্র ইতিহাস গড়ে তুলেছে। এখানেই অবস্থিত মল্লিকার্জুন স্বামী মন্দির—দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এবং একইসঙ্গে ভ্রমারম্বা দেবীর শক্তিপীঠও। ভারতের একমাত্র স্থান, যেখানে শিব ও পার্বতীকে একযোগে পুজো করা হয়। সেখানে শিব-শক্তির উপাসনাও হয়। 

স্কন্দ পুরাণ, শিব পুরাণ এবং মাল্যদি পুরাণ অনুসারে, শিব ও পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয় ব্রহ্মচর্য বরণ করে কুড়াচ পর্বতে ধ্যানমগ্ন হলে, তাঁদের সন্তানের প্রতি টানেই শিব-পার্বতী তাঁকে দেখতে শ্রীশৈলম পর্বতে আসেন। তখন থেকেই এই স্থান হয়ে ওঠে শৈলেশ্বর বা শ্রীশৈলম, আর শিব যেহেতু মল্লিকা (জেসমিন) ফুল দিয়ে পূজিত হন—তাঁকে বলা হয় 'মল্লিকার্জুন'।

এই মন্দিরের বিশেষত্ব এখানেই—একদিকে মল্লিকার্জুন স্বামী (শিব) স্বয়ম্ভু জ্যোতির্লিঙ্গরূপে বিরাজমান, অন্যদিকে পার্বতী রূপে ভ্রমারম্বা দেবী অবস্থান করছেন শক্তিপীঠ হিসেবে। বলা হয়, এখানে সতীর কান পড়েছিল—এজন্যেই এটি ৫১টি শক্তিপীঠের একটি।

সপ্তম শতকে নির্মিত হলেও পরবর্তীকালে চালুক্য, কাকতীয় ও বিজয়নগর রাজারা এই মন্দিরকে পূর্ণতা দিয়েছেন। ড্রাবিডিয়ান স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত বিশাল এই মন্দিরে চারটি গোপুরম, খোদাই করা স্তম্ভ ও সুপ্রসস্থ মণ্ডপ রয়েছে। মন্দির চত্বরে রয়েছে 'সহস্রলিঙ্গ'—হাজারো ক্ষুদ্র শিবলিঙ্গের নিদর্শন যা রাম ও পাণ্ডবদের সময়ের বলেও ধরা হয়। 

শ্রাবণ মাস ও মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ ভক্ত এখানে সমবেত হন। এই তীর্থ শুধু দক্ষিণ ভারতেরই নয়, গোটা ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শৈব তীর্থস্থান। 

এরই আশেপাশে রয়েছে আরও কিছু দর্শনীয় স্থান। য়েমন- 

১) সাক্ষী গণপতি মন্দির – ভক্তদের আগমনের প্রমাণ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য দেবতা।

২) আক্কা মহাদেবীর গুহা – এক শৈব সন্ন্যাসিনীর তপস্যাস্থল।

৩) পাথাল গঙ্গা – নদী থেকে জল এনে মল্লিকার্জুনে অর্ঘ্য দেওয়ার স্থান।

৪) শ্রীশৈলম বাঁধ – প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক আলাদা স্বাদ।

এখানে ভ্রমণের উপযুক্ত সময় শীতকাল (অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি) শ্রীশৈলম ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময়। বর্ষাকালে কিছুটা বিপজ্জনক হতে পারে। নিকটতম রেল স্টেশন মার্কাপুর রোড (~৮৫ কিমি)। হায়দরাবাদ থেকেও সহজে যাওয়া যায়। 

আশ্চর্যজনকভাবে, এই মন্দিরের ভেতরে ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দে রচিত বিজয়নগর যুগের একটি তাম্রশিলায় হ্যালির ধূমকেতু-র প্রথম ভারতীয় উল্লেখ পাওয়া গেছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রাচীন নির্মাণ কৌশল (চুন, গুড়, গাছের আঠা) ব্যবহার করে সংরক্ষণের কাজ করছে। 

শ্রীশৈলমের মল্লিকার্জুন মন্দির কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় তীর্থ নয়—এটি এক ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার কেন্দ্র। এখানে শিব ও শক্তি একসঙ্গে বিরাজ করছেন।

দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের গভীর পাহাড়ি অরণ্যে অবস্থিত শ্রীশৈলম — মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ ও ভ্রমারম্বা শক্তিপীঠের মিলনস্থল। কিন্তু এই পবিত্র স্থানটি কীভাবে পৌঁছানো যায় পশ্চিমবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র হাওড়া থেকে? চলুন জেনে নিই আপনার ভক্তিমূলক যাত্রার নিখুঁত রোডম্যাপ।

যদি খুব তাড়াতাড়ি যেতে চান, তাহলে প্লেনে করে যান, গিয়ে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করুন। তাহসেই খুব সহজে পৌঁছে যাবেন মল্লিকার্জুনে। অর্থাৎ হাওড়া থেকে যাবেন হায়দ্রাবাদ সেখান থেকে যাবেন শ্রীশৈলম। এছাড়াও অন্যভাবেও যেতে পারেন মল্লিকার্জুন। কলকাতার নেতাজি সুভাষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (CCU) থেকে প্রতি দিনই একাধিক ফ্লাইট রয়েছে হায়দরাবাদ রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (HYD) উদ্দেশে। ফ্লাইট সময় আনুমানিক ২.৫–৩ ঘণ্টা।  বিমানবন্দর থেকে শ্রীশৈলমের দূরত্ব প্রায় ২১০–২২০ কিমি। ক্যাব বা প্রাইভেট ট্যাক্সিতে গেলে সময় লাগবে আনুমানিক ৫–৬ ঘণ্টা। রাস্তাটি পাহাড়ি, তাই ড্রাইভার অভিজ্ঞ হওয়া জরুরি। এতে মোট সময় লাগবে ৭–৮ ঘণ্টা। মোট খরচ হবে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। এছাড়াও যাওয়া যাবে অন্যভাবেও, সেটা কীভাবে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক। দক্ষিণ ভারতে যাওয়া বেশ কিছু ট্রেন রয়েছে হাওড়া থেকে—যেমন Howrah–Tirupati Humsafar Express বা Howrah–SMVT Bengaluru Superfast Express। এগুলো থেকে Markapur Road বা Cumbum স্টেশনে নেমে যাওয়া যেতে পারে। এই স্টেশনগুলির থেকে শ্রীশৈলমের দূরত্ব ৮৫–১০০ কিমি। ট্যাক্সিতে গেলে ৩–৪ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব। যেতে সময় লাগবে ২২ থেকে ২৪ ঘন্টা আর যাত্রা পথে মোট খরচ ৩হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। 

হাওড়া থেকে মল্লিকার্জুন যাওয়ার একাধিক পথ থাকলেও, আপনি বেছে নিতে পারেন আপনার সময়, বাজেট এবং পছন্দ অনুযায়ী। কেউ চাইলে আরামে ফ্লাইটে যেতে পারেন, আবার কেউ চাইলে ট্রেন ধরে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু তীর্থযাত্রার স্বাদ নিতে পারেন। যেভাবেই যান না কেন, শ্রীশৈলমের মল্লিকার্জুন ও ভ্রমারম্বার দর্শন আপনার মনে দেবত্ব ছড়িয়ে দেবে — এ কথা নিশ্চিত।

শেয়ার করুন