ভারতীয় পুরাণজগতে ঈশ্বরের বহু রূপ ও অবতারের কাহিনি ছড়িয়ে আছে। দশাবতার, শতাবতার ছাড়াও এমন কিছু গোপন ও বিশেষ রূপ রয়েছে, যেগুলি সাধারণত প্রচলিত ধর্মচর্চার বাইরে হলেও আধ্যাত্মিক ও গুপ্ত জ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেমনই এক দুর্লভ, শক্তিময় ও রূপবিচিত্র অবতার হল — নবগুঞ্জর। নবগুঞ্জর শুধুমাত্র রূপে নয়, শক্তিতে, দর্শনে ও মহাজাগতিক বার্তায় এক অতুলনীয় অভিব্যক্তি। এই রূপে স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু নারায়ণ নয়টি ভিন্ন জীবের অঙ্গ ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করেন — অর্জুনের সামনে।
নবগুঞ্জর অবতারের কথা প্রাচীন ওড়িয়া মহাভারত-এ পাওয়া যায়, যা রচনা করেন কবি সরল দাস। এই কাহিনি মূল সংস্কৃত মহাভারতের অংশ নয়। ফলে নবগুঞ্জরের রূপ শুধু ওড়িশার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরম্পরায় জীবন্ত। এছাড়াও এই রূপের উপস্থিতি দেখা যায় ওড়িশার পটচিত্র শিল্পে, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে, এবং বিভিন্ন তান্ত্রিক ও লোকধর্মীয় বিশ্বাসে।
'নব' মানে নয়টি, 'গুঞ্জর' মানে গর্জনকারী বা চলমান রূপ -এখান থেকেই নবগুঞ্জর শব্দটি এসেছে। এই রূপে ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং নয়টি প্রাণীর অঙ্গ নিয়ে একত্রিত হয়ে এক অতিমানবীয় অবয়ব ধারণ করেন। এই রূপ কখনও সুন্দর, কখনও ভয়ংকর, আবার কখনও বিশুদ্ধ চৈতন্যের প্রতীক।
নবগুঞ্জরের মাথা মোরগের, ঘাড় ও গলা ময়ূরের, এনার তিনটি পা আছে- একটি হাতির, একটি বাঘের, একটি হরিণ বা ঘোড়ার। এছাড়াও এনার চতুর্থ অঙ্গ মানুষের হাত, যেখানে থাকে পদ্ম বা চক্র, পিঠে ষাঁড়ের কুঁজ, কোমর ও পেট সিংহের, লেজ সাপের। এই অদ্ভুত দর্শন রূপে ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেন একজন তপস্বীর সামনে। তিনি কে জানেন? তিনি স্বয়ং অর্জুন।
মহাভারতের এক অপ্রচলিত কাহিনিতে বলা হয় — অর্জুন গন্ধমাদন পাহাড়ে তপস্যা করছিলেন। সে সময় হঠাৎ এক অলৌকিক প্রাণী সামনে এসে উপস্থিত হয়। অর্জুন প্রথমে ভীত ও বিস্মিত হয়ে তার ওপর তীর ছুঁড়তে উদ্যত হন। কিন্তু প্রাণীটির হাতের পদ্ম বা সুদর্শন চক্র দেখে অর্জুন বুঝতে পারেন — এ কেবল একটি প্রাণী নয়, এ হল স্বয়ং ভগবান শ্রীবিষ্ণু নারায়ণ তাঁর গূঢ় রূপে, যিনি সকল জীব ও শক্তির মিলনে সৃষ্টি করেন নিজস্ব রূপ—নবগুঞ্জর। অর্জুন তৎক্ষণাৎ ধনুক ফেলে প্রণাম করেন নবগুঞ্জরের সামনে। এভাবেই ঈশ্বর জানান দেন — 'আমি সবকিছু। আমি পশু, পাখি, মানুষ, সাপ, সৌন্দর্য, শক্তি, ভয়, দয়া — সব একসঙ্গে।'
নবগুঞ্জর রূপ আসলে এক বিশ্বরূপ, যেখানে ঈশ্বর নিজের অস্তিত্ব কেবল এক মানবরূপে সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি সব জীবের মধ্যেই বর্তমান — তাঁর মধ্যে রয়েছে সৃষ্টি ও ধ্বংস, ভয় ও আশ্বাস, কৌতুক ও ধ্যান।
এই রূপের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য-
মোরগের মাথা জাগরণের প্রতীক। এটি আত্মসচেতনতার বার্তা দেয়। ময়ূরের গলা অহং ও সৌন্দর্যের প্রতীক। এটি আত্মবিশ্বাস বাড়াবার কথা বলে। হাতির পা-এর অর্থ বল ও ধৈর্য, যা স্থির থাকার কথা বলে। হরিণের পা কোমলতার চিহ্ণ বহন করে। এটা সংবেদনশীল। বাঘের পা- ভয়, যা সঙ্কটের মধ্যে সাহস জোগায়। মানুষের হাত জ্ঞানের প্রতীক, এটা ঈশ্বরীয় কর্মের কথা বলে। সাপের লেজ হল গোপন শক্তি, এটা কুণ্ডলিনী। সিংহের কোমর রাজশক্তির প্রতীক, এটা নেতৃত্ব করার বার্তা দেয়। ষাঁড়ের কুঁজ ধর্মের প্রতীক। ভারবহন ও কর্তব্যের বার্তা দেয়। অর্থাৎ এখান থেকে বোঝা যায় ঈশ্বর এক, কিন্তু বহুরূপী। জীবজগতে যা কিছু দেখা যায়, সব তাঁরই রূপান্তর।
নবগুঞ্জর রূপ ও জগন্নাথ দর্শনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মন্দিরের উত্তরপ্রাচীরে খোদাই করা আছে নবগুঞ্জর ও অর্জুনের একটি ভাস্কর্য। নীলাচক্রের বাইরের অংশে খোদাই আছে ৮টি নবগুঞ্জর রূপ, যেগুলি ধ্বজদণ্ডের দিকে মুখ করে আছে। পটচিত্র শিল্পেও নবগুঞ্জর জগন্নাথের এক গুপ্তরূপ হিসাবে গণ্য।
নবগুঞ্জরের পূজার প্রথা অনেকটাই বিষ্ণু পূজার মতো। তবে রয়েছে কিছু বিশেষ দিক। তাঁর প্রিয় ফুল তুলসী, জবা, অপরাজিতা। তাঁকে নিবেদন করা হয় সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ। তাঁ পুজোর মন্ত্র সকলের জন্য এক নয়, অদীক্ষিতদের জন্য 'ওঁ নমঃ ভগবতে বাসুদেবায়', দীক্ষিতদের জন্য 'ওঁ ক্ষং গুপ্তবিশ্বরূপায় নমঃ'। এই মন্ত্র গুরুর অনুমতি ব্যতীত জপ করা একেবারেই উচিত নয়। 'নবগুঞ্জর অভয় সংস্তব' - এই স্তোত্রে বিষ্ণুর নবগুঞ্জর রূপে ভক্তকে ভয়হীনতা প্রদান ও পাপ বিনাশের বার্তা দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য শ্লোক হল-
'যস্মানয়ি দয়ালতুস্ত্বমাভিমুখ্যং পুরানকরোঃ।
তস্মাৎ কদাপি কুত্রাপি কুতোৎপি ন ভয়ং মম॥'
- স্তোত্র পাঠ করলে কষ্ট, রোগ, ভয় ও শত্রুর কুপ্রভাব দূর হয়।
নবগুঞ্জর রূপ শুধুমাত্র এক পৌরাণিক রূপ নয়, এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, যেখানে ঈশ্বর নিজেকে এমনভাবে প্রকাশ করেন— যা আমাদের শেখায় সৃষ্টির প্রতিটি রূপেই তিনি আছেন। যেখানে অর্জুন নিজের সংকোচ, অহংকার, বিভ্রান্তি ত্যাগ করে ঈশ্বররূপ চিনতে শেখেন, সেখান থেকেই শুরু হয় ভক্তি ও আত্মসংশোধনের পথ।