Calcutta Television Network

ভয় থেকে বিশ্বাস! মা শীতলার মহিমা কথা...

এক সময় বাংলার প্রতিটি ঘরে এই ধ্বনি শুনতে পাওয়া যেত। সেই সময় ‘জ্বর’ আর ‘গুটি’ ছিল মৃত্যুর সমার্থক। আর সেই মৃত্যুভয়ের মাঝেই আশ্রয় ছিলেন এক দেবী — নাম শীতলা, কিন্তু তিনি বরদাত্রী মা, আবার কখনও ক্রুদ্ধ রোগদাত্রী। তাঁর কাছে ওষুধ নেই, আছে ছাই; চিকিৎসক নেই, আছে মানত। তবু তিনিই ছিলেন বাংলার ঘরে ঘরে রোগপ্রতিরোধের প্রথম ঈশ্বরী। 

গুটি বসন্তের দেবী তিনি, ভক্তদের মনে ভয় থেকে এসেছে বিশ্বাস। গুটি বসন্ত (smallpox) ছিল এককথায় প্রাণঘাতী। এই রোগ থেকে রেহাই পেত না কেউই। ছোট বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সকলেই এই রোগে কাবু হতেন। চিকিৎসা ছিল দুর্লভ, টিকাও ছিল অধরা। রোগের লক্ষণ দেখলেই বলা হত, 'শীতলা উঠেছে'। 

লোকবিশ্বাসে, শীতলা গুটির দেবী। যাঁর কাছে মানত করলেই গুটি থেমে যায়, জ্বর নেমে আসে। কিন্তু তাঁকে রাগানো মানেই বিপদ, রোগ ছড়িয়ে পড়ে গোটা গ্রামে। তাঁদের কথায় মা ভয়ানক। শীতলা দেবীকে কল্পনা করা হয় এক ভিন্ন রূপে। তাঁর হাতে ঝাঁটা ও জলভরা ঘড়া, পাশে থাকে একটি গাধা, যা তাঁর বাহন। তাঁর মুখখানা করুণায় মাখা, কিন্তু চোখে রয়েছে শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের ভীতিকর অভিব্যক্তি। 

তাঁকে ঠান্ডা রাখা জরুরি — তাই তাঁর পুজোয় গরম রান্না মানা। দেওয়া হয় ঠান্ডা ভাত আর টক দই, সাঁতলানো তরকারি। এই থেকেই এসেছে একটা প্রবাদ কথা,'শীতলা' অর্থাৎ শান্ত ও শীতল দেবী। 

শীতলা পুজো সাধারণত বসন্তকালে হয়। মেয়েরা উঠোনে তাঁর মূর্তি গড়ে, থানকে সাজিয়ে তাঁর পুজো করা হয়। সেই থানকে লাল সিঁদুর দিয়ে পুজো করা হয়। দই, দুধ, ফুল দিয়ে তাঁকে তুষ্ট করা হয়। অনেক জায়গায় তাঁকে ছাই দিয়েও পুজো করা হয়। গুটি রোগ থেকে বাঁচতে তাঁকে প্রণপণে ডাকা হয়। মনো করা হয় এই রোগ ছোঁয়াচে, তাই যাঁর এই রোগ হয়, তাঁর সংস্পর্শে কেউ আসেন না। তাঁর কাছে শুদ্ধ বস্ত্র পরে আসতে হয়। মনে করা হয়, কোনও বাচ্চা যদি গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাদের মা'রা সেই বাচ্চার কাছে আসতে পারে। বাচ্চাদের মা ছুটে যান মা শীতলার মন্দিরে মানত করেন তাঁর কাছে। আর কেউ যদি গুটি রোগে মারা যায়, তখন গ্রামের লোকেরা বলেন, 'মা রাগ করেছিলেন' আর কেউ এই রোগ থেকে বেঁচে গেলে বলেন, 'মা রক্ষা করলেন'। 

শীতলার কোনও বেদ নেই, বৈদিক মন্ত্র নেই। তিনি শাস্ত্রীয় হিন্দুধর্মের অন্তর্গত নন, বরং একেবারে লোকায়ত সমাজচেতনার সৃষ্টি। আদিবাসী, নিম্নবর্ণ, দলিত সমাজে তাঁকে সর্বাধিক পূজা করা হয়। তিনি একজন 'প্রাক-আর্য' রোগদেবী, যাঁকে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম পরে আপন করে নেয়। পুরাণে পরে কিছু উল্লেখ এলেও, তাঁর প্রকৃত জন্ম লোকজ রোগ ও ভয় থেকে। 

লোকমুখে জানা যায়, একবার এক নারী রান্না করে গরম ভাত খাইয়ে দেন শীতলাকে, দেবী রাগ করে পাঠান গুটি বসন্ত, আর তারপর শুরু হয় অগ্নি, মৃত্যু ও কান্না। অন্য আর একটা গল্প থেকে জানা যায়, এক আদিবাসী মেয়ে মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনে এক বাচ্চাকে, ও হয়ে ওঠে দেবী শীতলা। 

এই কাহিনীগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, শীতলা হলেন এমন একজন দেবী, যাঁর ভয়ে তাঁর পুজো করেন মানুষেরা। শীতলাকে মনে করা হয় আত্মরক্ষার কবচ। রোগ যখন ছিল অজানা, ওষুধও ছিল না, তখন মানুষ তৈরি করল এমন এক ‘রোগদেবী’, যাতে তার রাগ ঠেকিয়ে নিজেকে রক্ষা করা যায়। 

লোককথা অনুযায়ী, মা শীতলা দেবী শুধু গুটি রোগের দেবী নন, তিনি সকল মানুষের ত্রাতা। তাঁকে পুজো করলে সমস্ত বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। এখন লোকমুখে শীতলা হারিয়ে গেলেও তাঁকে নিয়ে ভয় কিন্তু আজও রয়ে গেছে। ইঁট-কাঠ-পাথরের শহরের কোথাও কোথাও এখনও তাঁর পুজো দেখতে পাওয়া যায়। তাঁকে ভক্তি সহকারে এখনও ডাকা হয়। যদিও আজ আর গুটি বসন্ত নেই। টিকা এসেছে, ওষুধ এসেছে। তবু অনেক গ্রামেই এখনও শীতলার থান আছে, সন্ধেবেলা কেউ কেউ গিয়ে মানত রাখে। কোনও বাচ্চার শরীর খারাপ হলে তাদের মা তাঁর কাছে মানত করে আসে, আর সেখান থেকে একটু ছাই নিয়ে আসে।

শেয়ার করুন