জীবনের পথে নানা প্রতিকূলতা, দুঃখ-কষ্ট, ঋণ ও রোগ — এ সব যেন আজকের সময়ে সাধারণ বাস্তবতা। তবে শাস্ত্র বলে, এই জটিলতা থেকে মুক্তি সম্ভব যদি মনোনিবেশ করা যায় মহাদেবের কৃপালাভে। শিবকে তুষ্ট করার বহু উপায়ের মধ্যে সবচেয়ে সরল, অথচ ফলপ্রসূ পন্থা হল — দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ স্তুতির পাঠ। এই স্তোত্র এমন এক উপাসনা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে না-গিয়ে শুধুমাত্র পাঠ করেই একজন ভক্ত সকল ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের দর্শনের পুণ্যফল লাভ করতে পারেন।
ভারতের ভৌগোলিক বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ — যেমন- সোমনাথ (গুজরাট), মল্লিকার্জুন (আন্ধ্রপ্রদেশ), কেদারনাথ (উত্তরাখণ্ড), মহাকালেশ্বর (মধ্যপ্রদেশ), বিশ্বেশ্বর (বারাণসী), রামেশ্বরম (তামিলনাড়ু) -এঁনারা প্রত্যেকেই মহাদেবের শক্তির এক বিশেষ প্রকাশ। এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের পূর্ণ দর্শন এক জীবনে সম্ভব না হলেও, দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ স্তুতির পাঠে সেই একই ফল লাভ হয়, বলছেন শিবপুরাণ।
শিবের অভিষেক এবং স্তোত্র পাঠ করতে যে বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না, সেটা এই উপাসনার অন্যতম বিশেষত্ব। প্রতিদিন বা প্রতি সোমবার পালন করা যেতে পারে এই পদ্ধতি- যেমন সকালে স্নান করে শুদ্ধ মনে ঠাকুর ঘরে বসতে হবে, ঘিয়ের প্রদীপ বা তেলের প্রদীপ জ্বালাতে হবে, শিবলিঙ্গে দুধ, ধুতুরা ফুল অর্পণ করতে হবে। এরপর মনোযোগ দিয়ে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ স্তুতি করতে হবে। সময় থাকলে ১০৮ বার জব করতে হবে।
মনে করা হয় শিবের স্তুতি করলে শিব প্রসন্ন হবেন এবং সকলের দুঃখ দূর হবে। মনের অস্থিরতা দূর হবে, মনের অস্থিরতা, ভয় ও নেতিবাচক চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এই স্তুতির মধ্যে শুধু জ্যোতির্লিঙ্গ নয়, রয়েছে শিবতত্ত্বের গভীর রূপ। ভোলানাথ কখনো ভক্তকে নিরাশ করেন না — এই বিশ্বাসই হল এই স্তোত্রের চালিকাশক্তি।
এছাড়াও 'আশুতোষ শশাঙ্ক শেখর' স্তোত্রেও আমরা এক অদ্ভুত শক্তি পাই। এই মন্ত্র পাঠ করলে শিবের কৃপায় একের পর এক পথ খুলে যাবে। আশুতোষ — যিনি সহজেই তুষ্ট হন, শশাঙ্ক শেখর — যাঁর জটায় চাঁদের স্থান, আর চিদম্বর — শুদ্ধ চৈতন্যের রূপে যিনি বিরাজমান। এই নামগুলো শুধু পরিচয় নয়, একেকটি তত্ত্ব, অনুভব, আর আধ্যাত্মিক বিস্তারের দিগন্ত।
এই স্তোত্রে শিবকে শুধু ধ্বংসের দেবতা হিসেবে নয়, অপরিবর্তনশীল ওঙ্কার, অবিনাশী আত্মা, ও জগতের স্রষ্টা রূপেও চিত্রিত করা হয়েছে। এই ভাবধারায় উঠে আসে উপনিষদীয় দর্শন — যেখানে শিবই পরম ব্রহ্ম। তিনি নিরাকার, কিন্তু তবুও অনুভবযোগ্য। তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে, তবুও প্রতিটি ক্ষণে উপস্থিত।
শিব এখানে জটাজুটধারী, বাঘছাল পরিহিত, ত্রিনয়নধারী, এবং নাগরাজ-আলঙ্কৃত এক আদিম ঋষি — যিনি যোগের মাধ্যমে আত্মার চূড়ান্ত মুক্তির পথ দেখান। এই বর্ণনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিবই হলেন সেই তপস্বী, যিনি পার্থিব বিলাসের ঊর্ধ্বে উঠে থেকেও ভক্তের ডাকে সাড়া দেন।
স্তোত্রের শেষাংশে স্পষ্ট এক মানবিক আকুতি — 'আমি সকল অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রর্থনা করি' - এটি যেন এক আত্মসমর্পণের ঘোষণা, যেখানে ভক্ত নিজের দুঃখ-ভয়ে ভরে দেয় চরণে।
‘ওম নমঃ শিবায়’ মন্ত্রটির পুনরুচ্চারণ শিবতত্ত্বের সর্বোচ্চ সাধনার দিক নির্দেশ করে। এটি শুধু এক জপ নয়, এটি হৃদয়ের ধ্বনি, এটি আত্মার আত্মীয় ডাক। এই মন্ত্র যেন স্তোত্রের এক কণ্ঠস্বর, যা অনুরণন তোলে ভক্তের মন থেকে শিবলোকে। এই স্তোত্র কেবল শিবের বন্দনা নয় — এটি এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞান, যেখানে শিবকে দেখা হয় মহাদেবের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হিসেবে। তিনি একই সঙ্গে তত্ত্ব, দর্শন, রস, প্রেম, ও মুক্তির মূর্ত প্রতীক।