Calcutta Television Network

লক্ষ্মীর অভিমানেই মর্ত্যে বিষ্ণু! তীরুপতি বালাজির অলৌকিক কাহিনি ও লোকবিশ্বাস...

ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ধনবান তীর্থস্থান — তীরুপতি বালাজি মন্দির, যা অবস্থিত অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর জেলায়, তিরুমালার ভেঙ্কটগিরি পর্বতের উপরে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত এখানে আসেন ভগবান ভেঙ্কটেশ্বর স্বামীর (বিষ্ণুর অবতার) দর্শনে। শাস্ত্র ও পুরাণ অনুসারে, এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত স্বয়ং বিষ্ণুর রূপ – বালাজি। তাঁর মাহাত্ম্য, অলৌকিক ঘটনা ও ভক্তিভাবনার কাহিনী আজও মানুষের হৃদয় আলোড়িত করে। 

তীরুপতি বালাজির ইতিহাস বহু প্রাচীন, যার উত্স খুঁজলে পৌরাণিক যুগেই পৌঁছাতে হয়। শ্রীমদ্ভাগবত ও বিষ্ণু পুরাণ অনুযায়ী, কলিযুগে যখন পৃথিবী দুর্নীতিগ্রস্ত হতে শুরু করল, তখন ভগবান বিষ্ণু ভেঙ্কটগিরি পর্বতে ভেঙ্কটেশ্বর রূপে অবতরণ করেন। বর্তমান স্থাপত্যের শুরু ৯ম শতকে, চোলা ও পাণ্ড্য রাজবংশের আমলে। পরে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা কৃষ্ণদেবরায় এই মন্দিরে ব্যাপক অর্থ সহায়তা ও সংস্কার করেন। 

একবার দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান বিষ্ণুর মধ্যে পারিবারিক মতানৈক্য হয়। রুষ্ট লক্ষ্মী স্বর্গ ত্যাগ করেন। বিষ্ণু তখন মর্ত্যে এসে তপস্যা শুরু করেন। একদিন পদ্মাবতী নামে এক রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যিনি আদতে ছিলেন লক্ষ্মীরই অবতার। ভগবান বিষ্ণু তাঁর প্রেমে পড়েন এবং তাঁদের বিবাহ হয় পৃথিবীতেই, যা বৈকুণ্ঠ প্রেমের মর্ত্যে অভিব্যক্তি। বলা হয়, সেই বিবাহের খরচ এখনও ভক্তরা মিটিয়ে যাচ্ছেন—এই বিশ্বাসে যে বালাজির কাছে দান করলে তাঁর ঋণ শোধ হয়। 

মূর্তিটি প্রাকৃতিক শালগ্রাম শিলা দিয়ে নির্মিত, যা স্বয়ং ভগবানের রূপ। মূর্তির চুল প্রাকৃতিক এবং কখনও জট পড়ে না, উকুন হয় না। ভগবানের গায়ের ত্বক থেকে প্রতিদিন গন্ধ বের হয় ও বিশেষ ঘাম ঝরে। মন্দিরের উপরে কোনও পাখি বসে না, কোনও প্রাণী উড়ে যায় না। গর্ভগৃহে দাঁড়িয়ে কানে শব্দ আসে, যেন সমুদ্র গর্জন করছে। 

তীরুপতিতে সবচেয়ে বিখ্যাত বিষয়গুলির একটি হল— লাড্ডু প্রসাদম — এটি বিশ্বে একমাত্র মন্দিরের প্রসাদ যেটি GI Tag পেয়েছে। বহু ভক্ত মনের বাসনা পূরণের আশায় তাঁদের মাথার চুল কেটে দেন বালাজিকে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার দান জমা হয়, যার মাধ্যমে হাসপাতাল, পাঠশালা, আশ্রম, সেবাকেন্দ্র পরিচালিত হয়। 

ভক্তরা মূলত পদযাত্রা করে মন্দিরে পৌঁছান। তিরুপতির নিচ থেকে ৩,৫০০ সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে যেতেই হয়। অনেকে ‘বালাজি ডাকেন বলেই’ সেখানে যেতে পারেন বলে মনে করেন। তাঁর পূজায় গাওয়া হয়— 'গোবিন্দা... গোবিন্দা...' -এই ধ্বনি পাহাড়ে বারংবার প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। 

স্কন্দ পুরাণে তিরুমালার কথা রয়েছে। বলা হয়, কলিযুগে ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যে সবচেয়ে বেশি কাল অবস্থান করেন ভেঙ্কটগিরিতে। শাস্ত্রমতে, বালাজির দর্শন হলে পাপ বিলীন হয়, এবং জন্মান্তরের বন্ধন ছিন্ন হয়। 

তীরুপতি বালাজি কেবল এক মন্দির নয়, এক ভক্তির তীর্থ, আত্মশুদ্ধির জায়গা, বিশ্বাসের চূড়ান্ত প্রকাশ। তাঁর কাছে চোখের জল ফেললে তবেই তিনি হাসেন, দান করলে তখনই তিনি ফিরিয়ে দেন আশীর্বাদ। 

শেয়ার করুন