'আরও ৫ মিনিট', 'এইটা শেষ করেই রাখছি', 'নোটিফিকেশনটা চেক করি শুধু' — এই ছোট ছোট বাক্যগুলোই আমাদের ঠেলে দেয় এক ভয়ঙ্কর অভ্যাসের দিকে—স্ক্রিন আসক্তি। আমরা বুঝতেই পারি না, কখন প্রয়োজন থেকে বিনোদন, বিনোদন থেকে অভ্যাস, আর অভ্যাস থেকে আসক্তিতে রূপ নেয় আমাদের স্ক্রিন টাইম।
স্ক্রিন আসক্তি (Screen Addiction) আজকের দিনে এমন এক নিরব ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে কেবল সময় নয়, আত্মবিশ্বাস, মনোযোগ ও সম্পর্ককেও খেয়ে ফেলছে। কীভাবে স্ক্রিনে আসক্তি আসে চলুন দেখে নিই সেই সব লক্ষণগুলো-
'দেখি সবাই কী করছে', 'এই ভিডিয়োটা ভাইরাল হয়েছে কেন?' -এই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় স্ক্রিনে আসক্তি। শুরুতে মনে হয় harmless—কিন্তু সেটাই প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিনে কাটানো হয়—কিন্তু তখনো নিজের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকে। একদিন নির্ধারিত সময়ের বাইরে স্ক্রিন ব্যবহার করলাম—তেমন কিছু নয়। কিন্তু এই 'ব্যতিক্রম' ধীরে ধীরে নিয়মে পরিণত হয়। আবার ধরুন, মন খারাপ? ফোন ধরো। একা লাগছে? ইনস্টা খোলা। বিরক্ত লাগছে? ভিডিয়ো স্ক্রল করো। আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে ফোন হয়ে ওঠে একমাত্র হাতিয়ার। ঘুমানোর সময়েও স্ক্রিন দেখছেন! জানেন কী এমন চলতে থাকলে আপনার বিপদ শিয়রে অপেক্ষা করছে। কাজের মধ্যেও রিলস
দেখছেন! এরফলে হতে পারে মারাত্মক বিপদ। তাই আজ থেকেই সাবধান হন। কোনও সময় ফ্রি আছেন মানেই যে আপনাকে ফোন দেখতে হবে এর কোনও মানে আছে কী? বেশি ফোন দেখলেই হতে পারে অস্বস্তি, বাড়তে পারে উদ্বেগ। মনের মধ্যে সবসময় খিটখিটে ভাব আসতে পারে। এসব যদি না চান তাহলে আজ থেকেই সাবধান হন।
আচ্ছা এবার আসি কয়েকটা লক্ষণ নিয়ে। এই লক্ষণগুলোর মধ্যে কোনো একটা দেখতে পেলে আগে থেকে সাবধান হন। এই যেমন ধরুন, ফোনের স্ক্রিনিং ছাড়া একটুও ভালো লাগছে না! এটা কিন্তু বিপদেরই একটা লক্ষণ। তারপর ধরুন যদি দেখেন কারো সঙ্গে মিশতে ইচ্ছা করছে না, শুধুই ফোন দেখতে ইচ্ছা করছে, তাহলে বুঝুন আপনার মধ্যে এসে গেছে এই স্ক্রিনিং আসক্তি। রাতে যদি বারবার ঘুম ভাঙে, একটানা ঘুম না হয় তাহলেও কিন্তু শিয়রে বিপদ অপেক্ষা করছে। আচ্ছা আপনার চোখে কী খুব চাপ লাগছে? চোখ কী দিবারাত্রি খুব জ্বালা হচ্ছে! বা চোখটা ভারি ভারি হয়ে যাচ্ছে? মাথায় প্রচণ্ড ব্যাথা করছে! তাহলে আগে থেকে সাবধান হন। ফোনে সময়টা একটু কম কাটান। আবার অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়, কেউ যখন বলে 'এত সময় ধরে ফোনে সময় কাটাস না', তখন মনে মনে তার ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়, এটাও কিন্তু স্ক্রিনিং আসক্তির লক্ষণ।
এই স্ক্রিন আসক্তির কারণে মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল করে। বাচ্চাদের বিকাশ ব্যাহত হয়। মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট হয়। বাস্তব জীবনের আনন্দ কমিয়ে দেয়। সম্পর্ককে দূরে ঠেলে দেয়। জীবনের গতি ও সৃজনশীলতা হ্রাস করে এই স্ক্রিনিং আসক্তিই। এছাড়াও নির্দিষ্ট সময় ফোন বন্ধ রাখার অভ্যাস। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপস মাঝে মাঝে আনইনস্টল করুন। রিয়েল লাইফ হবি তৈরি করুন—বই পড়া, আঁকা, হাঁটাহাঁটি এসব বাস্তবে করুন। রিল লাইফের জন্য এসব না করে রিয়েল লাইভের জন্য এইসব কাজগুলো করুন। দিনে অন্তত ১ ঘণ্টা 'No Digital Hour' রাখুন।
স্ক্রিন আমাদের শত্রু নয়, তবে তার দাস হয়ে গেলে জীবন থেমে যায়। এই আসক্তি কোনোদিনেই হঠাৎ করে আসে না। ধীরে ধীরে, নরম হাতে, অভ্যাসের নামে ঢুকে পড়ে। তাই আজই সময়—চোখ তুলে তাকান স্ক্রিন থেকে, আর খুঁজে নিন বাস্তব জীবনের রঙ।